নীড় / স্বাস্থ্য / কালোজ্বর কি? কালোজ্বরের লক্ষন এবং প্রতিরোধে করনীয়.!
black fever

কালোজ্বর কি? কালোজ্বরের লক্ষন এবং প্রতিরোধে করনীয়.!

কালাজ্বর (Visceral leishmaniasis) বা Black fever একটি পরজীবী ঘটিত দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী রোগ যা লেইসম্যানিয়া ডনোভানী (Leishmania donovani) নামক এক প্রকার প্রোটোজোয়া পরজীবীর সংক্রমনের মাধ্যমে ছড়ায় এবং বেলেমাছির কামড়ের সাহায্যে এটি বিস্তার লাভ করে। প্রথমে এটি মানুষের রক্তের ম্যাক্রোফেই দ্বারা বাহিত হয়ে অন্ত্রে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে লিভার, প্লীহা ও অস্থিমজ্জা আক্রান্ত করে বংশ বৃদ্ধি করে। এ রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর থেকে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২মাস থেকে ৬মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ম্যালেরিয়ার পরে এটিই পরজীবী ঘটিত রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সময়মতো এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে কালাজ্বরে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই রোগের লক্ষণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বিষণ্ণতা বা অবসাদ, জ্বর, ওজন হ্রাস পাওয়া, শরীরে ক্ষত, চামড়া কালচে হওয়া, কলিজা ও প্লীহার আকার বৃদ্ধি, রক্তশল্পতা ইত্যাদি। সাধারনত গ্রামীণ এলাকা সমূহে কালা জ্বর একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা।

কালা জ্বর সাধারনত বেলে মাছির কামড়ে ছড়ায়। বেলে মাছি ঘর এবং ঘরের আশপাশের ফাটলে বিশেষ করে স্যাঁতস্যাঁতে এবং আর্দ্র মেঝে, দেয়াল, কাঠের আসবাবপত্রের ফাটল, উইপোকার গর্ত, ভাঙ্গা ইট পাথরের নিচে এবং ঘরের আশপাশের ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে। এরা সাধারনত সন্ধ্যা থেকে ভোঁর পর্যন্ত সময়ে বেশি কামড়ে থাকে। কেবল মাত্র স্ত্রী জাতীয় বেলে মাছি এ রোগ ছড়ায়। স্ত্রী জাতীয় বেলে মাছি এদের ডিমের পরিপক্বতার জন্য পশু, পাখী এবং মানুষের রক্ত গ্রহন করে থাকে।

#কালোজ্বরের কারণ

বেলে মাছির কামড়ের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। রোগ সৃষ্টি করতে জীবাণুবাহিত স্ত্রী জাতীয় বেলে মাছির একটি কামড়ই যথেষ্ট। এটি শরীরে প্রবেশের পর থেকে রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রায় দুই থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় নিয়ে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর তা রক্তের লোহিত কণিকাকে আক্রান্ত করে এবং সেখানে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। ফলে লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙে যায় এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। বেলে মাছি সাধারনত নোংরা পরিবেশে বসবাস করে, বিশেষ করে যাদের বাড়িতে গরু আছে সেখানে বেশি থাকে।

#কালো জ্বর  কাদের হতে পারে

কালাজ্বর প্রবল এলাকা ভ্রমন করলে অথবা ঐসব এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের  কালাজ্বর  হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। ছোট বড় যেকোনো বয়সের মানুষেরই এ রোগ হতে পারে।

#কালো জ্বর কিভাবে ছড়ায়

  • স্ত্রী বেলে মাছির (Phlebotomus Sand Fly) কামড়ে মানুষের শরীরে কালা জ্বরের জীবাণু ছড়ায়।
  • সাধারনত কালাজ্বরের জীবাণুবাহী মাছি সন্ধ্যায় এবং রাতে সবচেয়ে বেশি কামড়ায়। তবে অনেক সময় ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করার সময় বা জঙ্গলে এরা দিনের বেলাও কামড়াতে পারে।
  • স্ত্রী জাতীয় বেলে মাছি একবার কামড়ালেই এ রোগ হতে পারে। সাধারনত কামড়ানোর দুই থেকে ছয় মাসের মধ্যে রোগের সংক্রমণ ঘটে।

#কালো জ্বরের লক্ষণ

  • প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর খুব আস্তে আস্তে শুরু হয় এবং জ্বর ৫ থেকে ৭ দিন ধরে উঠতে থাকে।
  • রোগীর শারীরিক দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। রোগী অসুস্থ বোধ করে এবং ওজন  ক্রমশ কমতে থাকে।
  • অজীর্ণতা এবং ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।
  • জ্বর অবিরাম থাকতে পারে আবার দিনে দুইবারও আসতে পারে। কিছুদিন পর আবার জ্বর আসে।
  • প্লীহা এবং যকৃত বৃদ্ধি পায়। প্রথমে প্লিহা নরম থাকে এবং পরে তা শক্ত হয়ে যায়।
  • হাত, পা, মুখমণ্ডল ও পেটের ত্বক কালো বর্ণ ধারণ করে।

#প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জ্বর থাকলে এবং লক্ষণ দেখে ম্যালেরিয়া নাশক ও এন্টিবায়েটিক জাতীয় ওষুধ সেবনেও কোন কাজ না হলে, এটা কালা জ্বর হতে পারে বলে ধারনা করা হয়। রোগ নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা কিংবা অস্থিমজ্জা, প্লীহা অথবা লসিকানালী থেকে নমুনা নিয়ে তার মধ্যে কালাজ্বরের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষা করা হতে পারে। আবার রেপিড ডায়াগনস্টিক টেস্টের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে অতি সহজেই কালাজ্বর রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।

#চিকিৎসা

কালাজ্বরের কোন প্রতিষেধক নেই। কালা জ্বর হয়েছে সন্দেহ হলে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ শনাক্ত করার পর তার পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। বর্তমানে এ রোগের চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল মিল্টেফোসিন বাংলাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটা সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেয়া হয়। এছাড়াও সোডিয়াম এন্টিমনি গ্লুকোনেট ( যা খুব অল্প ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়) এবং অ্যামফোটেরিসিন বি ডিঅক্সিকোলেট এই ওষুধ দুটিও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে যেকোনো ওষুধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন- যে মায়েরা বাচ্চাকে দুধ পান করায়, দুই বছরের নিচের শিশু, গর্ভবতী মহিলা, বিবাহিত মহিলা যারা নিয়মিত গর্ভনিরোধ ওষুধ গ্রহণ করে না কিংবা অধিক রক্তশূন্যতা, যক্ষ্মা, এইডস বা অন্য কোন জটিল রোগসহ কালাজ্বরের রোগী ইত্যাদি।

#কালো জ্বর প্রতিরোধে করনীয়

  • বেলে মাছি যাতে বংশ বৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য মাটির মেঝে বা দেয়াল ফাটলহীন ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং অবশ্যই মানুষের থাকার ঘর গোয়াল ঘর থেকে কিছুটা দূরে স্থাপন করতে হবে।
  • বেলেমাছি নিধনের জন্য ডিডিটি বা ম্যালাথিয়ন ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশেপাশে ঝোপঝাড়, নোংরা স্থান, ড্রেন, গরুর ঘর অথবা মাটির ঘরের দেয়ালের ফাঁকে নির্দিষ্ট সময় পরপর জীবাণুনাশক স্প্রে করে এই রোগ থেকে আমরা নিজেদের নিরাপদে রাখতে পারি।
  • সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে অযথা বাইরে না যাওয়াই ভাল। কারন- এই সময় মাছিগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। তাই, বাহিরে যাওয়ার একান্ত প্রয়োজন হলে, শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে, বড় হাতার শার্ট এবং বড় প্যান্ট অথবা লুংগি। বেশি সুরক্ষার জন্য মোজাও পড়তে পারেন।
  • বেলে মাছির (Phlebotomus Sand Fly) আকার মশার থেকেও ছোট। তাই ছোট একটি ফাঁক দিয়েও মাছি অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। তাই, দরজা ও জানালায় নেট ব্যবহার করতে হবে এবং ঘরের দেয়ালে কোন ফুটো থাকলে তা অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারী ব্যবহার করতে হবে এবং ভালো করে গুঁজে দিতে হবে। মাঝে মাঝে ঘরের চারপাশে জীবাণুনাশক ঔষধ স্প্রে করতে হবে।

#সবশেষে

যেহেতু শুধুমাত্র স্ত্রী জাতীয় বেলে মাছির কামড়ে এই রোগ হয় এবং একবার কামড় দিলেই এ রোগ হতে পারে। তাই, অবশ্যই বাসা বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং বাসার আশেপাশে কোন ময়লা বা ঝোপঝাড় হতে দেয়া যাবে না। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। আবার কালা জ্বর একবার হয়ে থাকলেও আবার হতে পারে। তাই কালা জ্বর প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সম্বন্ধে বিথী নাহার

এছাড়াও পড়ুন

chicken pox

জলবসন্ত বা চিকেনপক্স হলে করনীয় এবং এর দাগ দূর করার উপায়.!

জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chickenpox) অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ যা ভ্যারিসেলা জুস্টার ভাইরাস নামক এক ধরনের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 4 =