নীড় / মনীষীর জীবনী / ৩০. ত্যাগরাজ
Tagraj

৩০. ত্যাগরাজ

   ৩০. ত্যাগরাজ
( ১৭৬৭-১৮৪৭)

পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ইতিহাসে যেমন বিঠোফেন মোৎসার্টের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, ভারতীয় সঙ্গীতের জগতে তেমনি এক মহান পুরুষ ত্যাগরাজ । ভারতীয় সঙ্গীতের অতলান্ত সৌন্দর্যকে তিনি তুলে ধরেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে । তাঁর জীবনে সঙ্গীত আর ধর্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল । এই সাধক সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম দক্ষিণ ভারতের তাঞ্চোর জেলার তিরুভারুর নগরে । জন্ম তারিখ ৪ঠা মে ১৭৬৭ সাল । যদিও জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে ।

শোনা যায় ত্যাগরাজের পিতা রাম ব্রাহ্মণকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, তিনি খুবই শীঘ্রই একটি পুত্র সন্তানোর পিতা হবেন, এই পুত্র্র সঙ্গীত সাহিত্য ক্ষেত্রে মহাকীর্তিমান হবে ।

ত্যাগরাজের পিতা রাম ব্রাহ্মণ ছিলেন বিদ্বান ধার্মিক সৎ মানুষ । ছেলেবেলায় রামনবমী উৎসবের সময় ত্যাগরাজ বাবার সাথে গিয়ে রামায়ণ পড়তেন । তাঞ্জোরের রাজা রাম ব্রাহ্মণকে খুব শ্রদ্ধা করতেন । তিনি কিছু জমি আর একটি বাড়ি দিয়ে যান । এইটুকুই ছিল তাঁর সম্পত্তি ।

ত্যাগরাজের মা সীতামামার কন্ঠস্বর ছিল অপূর্ব । ত্যাগরাজের সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয় তাঁর মায়ের কাছে ।  সীতামামার ছিলেন সৎ উদার স্নেহশীলা । মায়ের এই সব চারিত্রিক গুণগুলি ত্যাগরাজের জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল ।

ত্যাগরাজের শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার কছে । প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হলেন তিরুভাইয়ের সংস্কৃত স্কুলে । ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ফুটে উঠেছিল কবি প্রতিভা । যখন তিনি ছয় বছরের বালক, ঘরের দেওয়ালে প্রথম কবিতা লেখেন । তারপর থেকে নিয়মিতভাবেই তিনি কবিতা রচনা করতেন । এই সব কবিতাগুলির মধ্যে শিশুসুলভ সরলতা থাকলেও তাঁর প্রতিভার প্রকাম লক্ষ্য করা যায় । স্থানীয় কয়েকজন পন্ডিত ত্যাগরাজের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

বাবা যখন ভজন গাইতেন তিনিও তাঁর সাথে যোগ দিতেন । অন্য সব গানের চেয়ে ভজন তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করত । এই সময় তিনি দুটি ভজন রচনা করেন “ নমো নমো রাঘবায়” ও “তব দাসোহম”- এই দুটি ভজন পরবর্তীকালে খুবিই জনপ্রিয় হয়েছিল ।

ত্যাগরাজের বাবা প্রতিদিন সকালে পূজা করতেন । তাঁর পূজার ফল আনবার জন্য ত্যাগরাজ কিছুদূরে একটি বাগানে যেতেন। পথের ধারে সেন্টি বেঙ্কটরমানাইয়ারের বাড়ি । বেঙ্কটরমানাইয়ার ছিলেন নামকরা সঙ্গীত গুরু । বাড়িতে নিয়মিত ছাত্রদের সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন । ত্যাগরাজ বেঙ্কটরমনাইয়ার বাড়ির সামনে এলেই দাঁড়িয়ে পড়তেন । গভীর মনোযোগ সহকারে তাঁর গান শুনতেন । একদিন রাম ব্রাহ্মণের ব্যাপারটি নজরে পড়ল । তিনি বেঙ্কটরমনাইয়ের উপর ছেলের সঙ্গীতশিক্ষার ভার দিলেন ।

ত্যাগরাজের শৈশব কৈশোর কেটেছিল সঙ্গীত ও সাহিত্য শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে বাবা-মায়ের কাছে একদিকে তেমনি সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করতেন বাবার সাথে । মহাকাব্য পুরাণ সঙ্গীত বিষয়ক বিভিন্ন রচনার সাথে অল্প বয়সেই পরিচিত হয়ে ওঠেন । উত্তরকালে সঙ্গীত বিষয়ে যে সব রচনা প্রকাশ করেছিলেন, প্রথম জীবনেই তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ।

সে যুগের সঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গীতশাস্ত্র সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ছিল না । তাই তাদের গানের মধ্যে নানান ব্যাকরণগত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যেত । ত্যাগরাজ প্রথমরাগসঙ্গীতকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চালিত করে সঠিক পথে নিয়ে আসেন ।

ত্যাগরাজের পিতার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না । তাই উত্তরাধিকারসূত্রে বাড়ির অংশ ছাড়া আর কিছুই পাননি । কিন্তু তার জন্যে ত্যাগরাজের জীবনে কোন ক্ষোভ ছিল না ।প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবন ছিল সহজ সরল মহৎ আদর্শের সেবায় উৎসর্গীকৃত । নিজের, সংসারের ও শিষ্যদের ভরণপোষণের জন্য সামান্য কিছু জমি আর ভিক্ষাবৃত্তির উপরেই প্রধানত নির্ভরশীল ছিলেন ।

১৮ বছর বয়সে ত্যাগরাজের বিবাহ হয় । স্ত্রী ছিলেন ত্যাগরাজের যোগ্য সহধর্মিণী । ত্যাগরাজের খ্যাতির কথা শুনে তাঞ্জোরের মহারাজা তাঁকে নিজের সভাগায়ক হিসাবে আমন্ত্রণ জানান । দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জোর সঙ্গীতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য স্থান । বহু মহান সঙ্গীত শিল্পী এখানে জন্মগ্রঞণ করেছিলেন । প্রায় তিনশো বছর (১৬০০-১৯০০) ধরে তাঞ্জোর ছিল সঙ্গীতের পীঠস্থান । এখানকার রাজারা ছিলেন সঙ্গীতের প্রধান পৃষ্ঠস্থান । কিন্তু রাজপরিবারের কোন সম্মানের প্রতি তাঁর সামান্যতম আকর্ষণ ছিল না তাই এই লোভনীয় প্রস্তাব তিনি হেলায় প্রত্যাখান করেন । অর্থের লালসাকে তিনি ঘৃণা করতেন ।

তাঁর বাড়িতে সব সময়েই শিষ্য, গায়ক, পন্ডিতদের ভিড় লেগেই থাকত । এদের কেউ থাকত কয়েকদিন, কেউ কয়েক সপ্তাহ আর কেউ কয়েকমাস । এদের ভরণপোষণের জন্য সপ্তাহে একদিন ভিক্ষায় বার হবেন ত্যাগরাজ । তাঞ্জোরের মানুষ তাঁকে এত সম্মান করত, একদিনের ভিক্ষায় যা পেতেন তাতেই ভালভাবে সমস্ত সপ্তাহের ব্যয় মেটাতে পারতেন।

তাঁর এই ভিক্ষাবৃত্তি ছিল বড় অদ্ভুত । কোন গৃহের দ্বারে যেতেন না । পথ দিয়ে ভজন গাইতে গাইতে হাঁটতেন । তাঁর কন্ঠস্বর ছিল যেমন উদাত্ত তেমনি মধুর । চারদিকে এক স্বর্গীয় পরিমন্ডল সৃষ্টি হত । পথের দুপাশের গৃহস্থরা যার যা সামর্থ্য ছিল, ভক্তিভরে এসে দিত ত্যাগরাজকে ।

ত্যাগরাজ তখন সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছেন । একদিন কাঞ্চিপুরম থেকে হরিদাস নামে এক ব্যাক্তি তাঁকে ৯৬ কোটি বার রামনাম জপ করতে বলেন । ত্যাগরাজের মনে হল এ ইশ্বরের আদেশ – একে কোনভাবেই লঙ্ঘন করা যাবে না । তারপর থেকে দীর্ঘ ২১ বছর তিনি প্রতিদিন ১,২৫,০০০ বার করে রামনাম জপ করতেন । তাঁর স্ত্রী ও তাঁর সাথে এইভাবে জপ করতেন। শোনা যায় মাঝে মাঝে জপ করতে করতে একসময় এত আত্মমগ্ন হয়ে যেতেন, তখন তাঁর মনে হত স্বয়ং রাম যেন তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন । তিনি দুচোখ মেলে তাঁকে প্রত্যক্ষ করতেন । মনের এই অনুভূতিতে তিনি রচনা করেছিলেন একটি বিখ্যাত গান “ কান গোন্টিনি” ( আমি দেখা পেয়েছি ) । মাঝে মাঝে যখন শ্রীরামের দর্শন  পেতেন না, তাঁর সমস্ত মন বেদনায় ভরে উঠত । এমনি এক সময়ে লিখেছিলেন “ এলা নি দাইয়া রাহু”-তুমি কেন আমার প্রতি সদয় নও ।

ক্রমশই ত্যাগরাজের খ্যাতি তাঞ্জোরের সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তের ছড়িয়ে পড়ছিল । তাঁর রচিত গান বিভিন্ন অঞ্চলের গায়কেরা গাইতে আরম্ভ করল । শিক্ষার ব্যাপারে প্রাচীনকালের সঙ্গীত শিক্ষকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত সংকীর্ণ গোঁড়ামি । তারা নিজেদের সঙ্গীতকলাকে শুধুমাত্র সন্তান আর শিষ্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখত । কিন্তু ত্যাগরাজ ছিলেন সমস্ত সংকীর্ণতার উর্দ্ধে ।

যখন তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, দূর-দূরান্ত থেকে সঙ্গীতজ্ঞরা তাঁর কাছে আসত তাঁকে দর্শন করতে তিনি তাদের নিজের গৃহে আমন্ত্রণ করতেন, সেবা করতেন, নতুন গান যা তিনি রচনা করতেন তা শেখাতেন ।

ত্যাগরাজ গানের সঙ্গে বীণা বাজাতেন । এই বীণাটিকে তিনি প্রত্যহ পূজা করতেন, গান শেষ হলে বীণাটি থাকত তাঁর পূজার ঘরে ।
ত্যাগরাজের জীবন কাহিনী অবলম্বন করে বহু অলৌকিক প্রচলিত । তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হল স্বরার্ণব ( ইশ্বরের অনুগ্রহে প্রাপ্ত ) । এই গ্রন্থে শিব ও পার্বতীর কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে সঙ্গীত বিষয়ে নানান আলোচনা করা হয়েছে । এই স্বরার্ণব গ্রন্থটি নাকি স্বয়ং নারদ ত্যাগরাজকে উপহার দিয়েছিলেন ।

একটি কাহিনী প্রচলিত যে এক সন্ন্যাসী ত্যাগরাজের বাড়িতে এসে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কিছু পুঁথি দিয়ে যান । রাওতে ত্যাগরাজ স্বপ্ন দেখলেন স্বয়ং দেবর্ষি তাঁর সামনে এসে বলছেন, তোমার গানে আমি তৃপ্ত হয়েছি, তাই পুঁথিগুলি রেখে গেলাম । এর থেকে তুমি নতুন পুঁথি রচনা কর । সেই সব পুঁথি থেকে রচিত হয় ‘স্বরার্ণব’ ।

ত্যাগরাজের জীবনে এই ধরনের ঘটনা আরো কয়েকবার ঘটেছে । যখনই তিনি গভীর কোন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, কোন অলৌকিক শক্তির কৃপায় রক্ষা পেয়েছেন । যখন তিনি মাত্র পাঁচ বছরের বালক, গুরুতর অসুখে পড়েন, সকলেই তাঁর জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল, এমন সময় এক সন্ন্যাসী এসে ত্যাগরাজের বাবাকে বললেন, কোন চিন্তা করো না, তোমার পুত্র কয়েকদিনেই সুস্থ হয়ে উঠবে । পরদিনই একেবারে সুস্থ হয়ে গেলেন ত্যাগরাজ ।

জীবনে শুধু ইশ্বর অনুগ্রহ পাননি ত্যাগরাজ । তাঁর জীবনও ইশ্বরের মতই পবিত্র । তাঁকে দেখে মনে হত সাক্ষাৎ যেন পুরাকালের কোন ঋষি-স্থির শান্ত নম্র । চোখে-মুখে সর্বদাই ফুটে উঠত এক পবিত্র আভা । যে মানুষই তাঁর সান্নিধ্যে আসত তারাই মুগ্ধ হয়ে যেত ঔদার্যপূর্ণ ব্যবহারে । কেউ যদি কখনো তাঁর সাথে রূঢ় আচরণ করত, তাঁর প্রতিও তিনি ছিলেন উদার । কখনো তাঁর মুখ দিয়ে একটিও কটু বাক্য বার হত না । তিনি বলতেন, যাই হোক না কেন সর্বদাই সত্যের পথ আঁকড়ে ধরে থাক । ইশ্বরের করুণা একদিন তোমার উপর বর্ষিত হবেই ।

এই প্রসঙ্গে ত্যাগরাজ নিজেই বলেছেন, “ইশ্বরের নামগান গুণকীর্তনের সাথে যদি শুদ্ধ শ্রুতি, শুদ্ধ স্বর, শুদ্ধ লয়ের সংমিশ্রণ ঘটে তবেই দিব্য আনন্দের উপলব্ধি হয় ।’’

ত্যাগরাজের স্ত্রী মারা যায় ১৮৪৫ সালে । তারপর থেকেই ত্যাগরাজের জীবনে পরিবর্তন শুরু হল । দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়েই তিনি ঈশ্বরের ধ্যানে আত্মমগ্ন হয়ে থাকতেন ।

মৃত্যুর দশ দিন আগে তিনি স্বপ্ন দেখলেন তাঁর প্রভু যেন তাঁকে ডাকছেন । আর দশ দিনের মধ্যেই তাঁর জীবন শেষ হবে । তাঁর স্বপ্নকে গিরিপাইনেলা ( কেন তুমি গিরি-চূড়া শীর্ষে) এই গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন । মৃত্যুর আগে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন । তাঁর সব শিষ্যদের বললেন, তোমরা নামগান কর, আগামীকাল আমি মহাসমাধিতে বসব ।

চারদিক থেকে শিষ্য ভক্তের দল জমায়েত হতে থাকে । ভজন গানে চারদিকে মুখরিত হয়ে উঠল । নির্দিষ্ট সময়ে ধ্যানে বসলেন ত্যাগরাজ । কিছুক্ষণ পর তাঁর দেহ থেকে এক অপূর্ব আলোকচ্ছটা বেরিয়ে এল। সেই সাথে মহাপ্রয়াণ ঘটল এই সাধক সঙ্গীত শিল্পীর ।

তাঁকে কাবেরী নদীর তীরে গুরু সেঁন্টি বেঙ্কটরমানাইয়ার সমাধির পাশে সমাহিত করা হল ।(১৮৪৭ সালের ৬ ই জানুয়ারি )।

প্রায় দেড়শো বছর আগে ত্যাগরাজ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর সঙ্গীত বেঁচে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে । তিনি তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে ভারতের সনাতন আত্মাকে তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের কাছে । তাই আজও তাঁর সঙ্গীত মানুষকে আপ্লুত করে । উত্তীর্ণ করে অন্য এক জগতে ।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six − six =