নীড় / মনীষীর জীবনী / ৪৬. স্বামী বিবেকানন্দ

৪৬. স্বামী বিবেকানন্দ

৪৬. স্বামী বিবেকানন্দ
[১৮৬৩-১৯০২]

ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিবেকানন্দ এক যুগপুরুষ । ভারত আত্মার মূর্ত রূপ । তাঁরই মধ্যে একই সাথে মিশেছে ইশ্বর প্রেম, মানব প্রেম আর স্বদেশ প্রেম । তাঁর জীবন ছিল মুক্তির সাধনা- সে মুক্তি জাতির সর্বাঙ্গীন মুক্তির । অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বক্ষেত্রেই মানুষ যেন নিজেকে সকল বন্ধনের উর্দ্ধে নিয়ে যেতে পারে । সন্ন্যাসী হয়েও ঈশ্বর নয়, মানুষই ছিল তাঁর আরাধ্য দেবতা । তাই মানুষের কল্যাণ, তাদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলই ছিল তাঁর সাধনা ।
তিনি বলতেন, “ যে সন্ন্যাসীর মনে অপরের কল্যাণ করার ইচ্ছা নেই সে সন্ন্যাসীই নয় । বহুজনহিতায় বহুজনসুখায় সন্ন্যাসীর জন্ম । পরের জন্য প্রাণ দিতে, জীবের গগনভেদী ক্রন্দন নিবারণ করতে, সকলের ঐহিক ও পরমার্থিক মঙ্গল করতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে ব্রহ্মসিংহকে জাগরিত করতে সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছে ।”
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন সর্ব মানবের কাছেই এক আর্দশ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রথম উচ্চারণ করলেন,ঈশ্বর নয় মানুষ। মানুষের মধ্যেই ঘটবে ঈশ্বরের র্পূণ বিকাশ। তিনি যুঘ যুগান্তরের প্রথা ধর্ম সংস্কার ভেঙ্গে ফেলে বলে উঠলেন আমরা অমৃতের সন্তান। শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরলেন সেই অমৃতময় বানী। পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসাবে দৃপ্ত কন্ঠে বললেন, I have a message to the west. তাঁর সেই Message-প্রাসঙ্গিকতা আরো গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে পারছে বর্তমান বিশ্ব।

বিবেকানন্দের আবির্ভাবেকাল এমন একটা সময়ে যখন বাংলার বুকে শিক্ষা সাহিত্য ধর্ম সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই শুরু হয়েছে নবজাগরণের যুগ। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ধনী শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তিদের মধ্যে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বিবেকানন্দের পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন উত্তর কলকাতার নামকরা আইনজীবী। তাঁর মধ্যে গোঁড়া হিন্দুয়ানী ছিল না। বহু মুসলমান পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক ছিল। উদার বন্ধুবৎসল দয়ালু প্রকৃতির রোক ছিলেন তিনি।

বিশ্বনাথ দত্তের কন্যাসন্দান থাকলেও কোন পুত্র ছিল না। স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী শিবের কাছে নিত্য প্রার্থনা করতেন। অবশেষে ১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারী জন্ম হল তাঁর প্রথম পুত্রের। ডাক নাম বিলো, ভাল নাম শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত। যদওি তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত স্বামী বিবেকানন্দ নামে।

ছেলেবেলায় নরেন্দ্রনাথ ছিলেন যেমন চঞ্চল তেমনি সাহসী। সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অদম্য কৌতহল। বাড়িতে গুরুমহাশয়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হলেন মেট্রোপলিটন ইনষ্টিটিউশনে। তিনি সর্ব বিষয়ে ছিলেন ক্লাসের সেরা ছাত্র। কৈশোরেই তাঁর মধ্যে দয়া-মায়া, মমতা, পরোপকার, সাহসিকতা, ন্যায়বিচার প্রভৃতি নানা গুণের প্রকাশ ঘটেছিল।

নরেন্দ্রনাথ ছিলেন সুঠাম স্বাস্থোর অধিকারী। ছেলেবেলা থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, কুস্তি, বক্সিং দুটিতেই ছিল তাঁর সমান দখল নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। কর্মক্ষেত্রে সবল-নিরোগ দেহের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই তিনি চির রুগ্ন বাঙ্গালীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, গীতা পাঠ করার চেয়ে ফুটবল খেলা বেশী উপকারী।

১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে নরেন্দ্রনাথ জেনারেল এসেম্বলী ইনষ্টিটিউশনে এফ,এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন, এখানকার অধ্যক্ষ ছিলেন উইলিম হেষ্টি। তিনি ছিলেন কবি দার্শনিক উদার হৃদয়ের মানুষ। তাঁর সান্নিধ্যে এসে দেশ বিদেশের দর্শনশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। নরেন্দনাথের সহপাঠী ছিলেন ডঃ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। পরবর্তীকালে যিনি এই দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। l দর্শনশাস্ত্রে এতখানি বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন, অধ্যক্ষ উইলিয়ম হেষ্টি তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, “দর্শনশাস্ত্রে নরেন্দ্রনাথের অসাধারণ দখল, আমার মনে হয় জার্মানী ও ইংল্যান্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই তার মত মেধাভী ছাত্র নেই।

পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের অনুশীলনে নরেন্দ্রনাথের চিন্তার জগতে এক ঝড় সৃষ্টি করল। একদিকে  প্রচলিত বিশ্বাস ধ্যান ধারণা সংস্কার, অন্যদিকে নবচেতনা-এই দুয়ের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত নরেন্দ্রনাথ প্রকৃত সত্যকে জানার আশায় ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিলেন।

ব্রাহ্মধর্মের মতবাদ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, নারীদের প্রতি মর্যাদা তাকে আকৃষ্ট করলেও ব্রাহ্মদের অতিরিক্ত ভাবাবেঘ, কেশবচন্দ্রকে প্রেরিত পুরুষ হিসাবে পূজা করা তাঁর ভাল লাগেনি। কিন্তু এই সময় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপদেশে তিনি নিয়মিত ধ্যান করতে আরম্ভ করলেন। আচার-ব্যবহারে, আহারে, পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি প্রায় ব্রাহ্মচারীদের মতই জীবন যাপন করতেন।

যতই দিন যায় সত্যকে জানার জন্যে ব্যাকুলতা ততই বাড়তে থাকেঅ পরিচিত অপরিচিত জ্ঞানী মূর্খ সাধুসেন্ত যাদেরই সাথে সাক্ষাৎ হয়, তিনি জিজ্ঞাসা করেন ঈশ্বর আছেন,কি নেই? যদি ঈশ্বর থাকেন তবে তাঁর স্বরুপ কি?-কারোর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর পান না। ক্রমশই মনের জিজ্ঞাসা বেড়ে চলে। বার বার মনে এমন কি কেউ নেই যিনি এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারেন।

১৮৮০ সালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সিমলাপল্লীতে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই প্রথম রামকৃষ্ণের সাথে পরিচয় হল নরেন্দ্রনাথের। নরেন্দ্রনাথের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ঠাকুর তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

প্রথম পরিচয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের মনে কোন রেখাপাত করতে পারেননি। পরীক্ষার ব্যস্ততার জন্য অল্পদিনেই নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণের কথা ভুলে যান। এফ এ পরীক্ষার পর বিশ্বনাথ দত্ত পুত্রের বিবাহের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু বিবাহ করে সংসার জীবনে আবদ্ধ হবার কোন ইচ্ছাই ছিল না নরেন্দ্রনাথের। তিনি সরাসরি বিবাহের বিরুদ্ধে নিজের অভিমত প্রকাশ করলেন।

১৯০১ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী বেলুড় মঠের ট্রাষ্ট ডীড রেজিষ্ট্রী হয়। ১০ই ফেব্রুয়ারি মঠের ট্রাষ্টীদের সর্বসম্মতিক্রমে স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ এবং স্বামী সারনানন্দ সাধারণ সম্পাদক হন। স্বামীজী মঠের সমস্ত কাজকর্ম থেকে প্রকৃতপক্ষে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যান। কেউ কোন পরামর্শ চাইলে তিনি তাদের বুদ্ধিমত কাজ করার পরামর্শ দিতেন। অত্যধিক পরিশ্রমে স্বামীজীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিল। বেশির ভাগ সময় ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে জাপানী পন্ডিত ডাঃ ওকাবুর সাথে বুদ্ধগয়য়ে গেলেন। সেখান থেকে কাশী। কিছুদিন পর আবার বেলুড়ে ফিরে এলেন। শরীর একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল। ১৯০২ সালের ৩রা জুলাই স্বামীজী তাঁর ভক্ত-শিষ্যদের খাওয়ার পর নিজে হাত ধুইয়ে দিলেন। একজন জিজ্ঞাসা করল আমরা কি আপনার সেবা গ্রহণ করতে পারি? স্বামীজী বললেন, যীশুও তার শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।

পরদিন ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই স্বামীজী সকাল থেকেই উৎফুল্ল ছিলেন। সকলের সঙ্গে একসাথে খেয়ে সন্ধ্যায় পর নিজের ঘরে ধ্যানে বসলেন রাত ৯টা ৫০ মিনিটে সেই ধ্যানের মধ্যেই মহাসমাধিতে ডুবে গেলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৯ বছর ৬ মাস।

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 3 =