নীড় / মনীষীর জীবনী / ২৪. প্লেটো
plato

২৪. প্লেটো

২৪. প্লেটো
(খ্রীস্টপূর্ব ৪২৭- খ্রীস্টপূর্ব ৩৪৭)

সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল- মানুষের চিন্তা আর জ্ঞানের জগতে তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র । সক্রেটিসের মধ্যে যে চিন্তার উন্মেষ ঘটেছিল; প্লেটো, অ্যারিস্টটল তাকেই সুসংহত দর্শনের রূপ দিলেন । এঁরা শুধু যে গ্রীসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক তাই নয়, সমগ্র ইউরোপের জ্ঞানের জগতে যুগপুরূষ । প্লেটো ছিলেন সেই সব সীমিত সংখ্যক মানুষদের একজন যাঁরা ইশ্বরের অকৃপণ করূণা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন- তাঁর জন্ম হয়েছিল সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারে ।

অপরূপ ছিল তার দেহলাবণ্য, সুমিষ্ট কন্ঠস্বর, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানের প্রতি আকাঙ্খা, সক্রেটিসের মত গুরুর শিষ্যত্ব লাভ করা, সব কিছুতেই তিনি ছিলেন সৌভাগ্যবান ।

পিতা ছিলেন এথেন্সের বিশ্ষ্টি ব্যক্তি । কিন্তু আভিজাত্যের কৌলিন্য তাঁকে কোনদিন স্পর্শ করেনি । রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তিনি বরাবরই ছিলেন উদাসীন । বাস্তব জীবনের জটিলতা, সমস্যার চেয়ে জ্ঞানের সীমাহীন জগৎ তাঁর মনকে আরো বেশি আকৃষ্ট করত । ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ভাবুক আর কল্পনাপ্রবণ । এক সময় এথেন্স সর্ববিষয়ে সমৃদ্ধ । প্লেটো যখন কিশোর সেই সময়ে সিসিলির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এথেন্স । এই যুদ্ধের পর থেকেই শুরু হল এথেন্সের বিপর্যয় । দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত হল স্বৈরাচারী শাসন । সমাজের সর্বক্ষেত্রে দেখা দিল অবক্ষয় আর দুর্নীতি ।

প্লেটো বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা লাভ করেছে । তাঁদের কারোর কাছে শিখেছেন সংগীত, কারোর কাছে শিল্প, কেউ শিখিয়েছেন সাহিত্য আবার কারো কাছে পাঠ নিয়েছেন বিজ্ঞানের । সক্রেটিসের প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল প্লেটোর গভীর শ্রদ্ধা । সক্রেটিসের জ্ঞান, তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতির প্রতি কিশোর বয়েসেই আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন । কুড়ি বছর রয়েছে তিনি সক্রেটিসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন ।

তরূণ প্লেটো অল্পদিনর মধ্যেই হয়ে উঠলেন সক্রেটিসের সবচয়ে প্রিয় শিষ্য । গুরুর বিপদের মুহূর্তে ও প্লেটো ছিলেন তাঁর নিত্য সঙ্গী ।

বিচারের নামে মিথ্যা প্রহসন করে সক্রেটিসকে হত্যা করা হল । সক্রেটিসের মৃত্যু হল কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞার আলো জ্বলে উঠল শিষ্য প্লেটোর মধ্যে । প্লেটো শুধু যে সক্রেটিসের প্রিয় শিষ্য ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন গুরুর জ্ঞানের ধারক বাহক । গুরুর প্রতি এত গভীর শ্রদ্ধা খুব কম শিষ্যের মধ্যেই দেখা যায় । প্লেটো যা কিছু লিখেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর প্রধাণ নায়ক সক্রেটিস । এর ফলে উত্তর কালের মানুষদের কাছে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে । সক্রেটিসকে কেন্দ্র করে প্লেটো তাঁর সব সংলাপ তত্ত্বকথা প্রকাশ করেছেন । সবসময়েই প্লেটো নিজেকে আড়ালে রেখেছেন-কখনোই প্রকাশ করেননি । সক্রেটিসের জীবনের অন্তিম পর্যায়ের যে অসাধারণ বর্ণনা করেছেন প্লেটো তাঁর “সক্রেটিসের জীবনের শেষ দিন” গ্রন্থে, জগতে তার কোন তুলনা নেই । প্লেটোর মত প্রতিভাবান পুরূষ যে শুধুমাত্র সক্রেটিস কে অন্ধ অনুসরণ করে তাঁর অভিমতকেই প্রকাশ করেছেন, এ কথা মেনে নেওয়া কষ্টকর । তাঁর কথোপকথনগুলি দীর্ঘকাল ধরে রচনা করা হয়েছে । প্লেটোর মত একজন মহান চিন্তাবিদ দার্শনিক সমস্ত জীবন ধরে শুধু সক্রেটিসের বাণী প্রচার করবেন,একথা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না । তাই পন্ডিত ব্যক্তিদের ধারণা, প্লেটো তাঁর নিজের অভিমতকেই প্রকাশ করেছেন । তাঁর এই সব অভিমতের উৎস ও প্রেরণা হচ্ছে সক্রেটিসের জীবন ও তাঁর বাণী ।

গুরুর মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন প্লেটো । তার কয়েক বছরের মধ্যেই এথেন্স স্পার্টার হাতে সম্পূর্ণ হাতে বিধস্ত হল । আর এথেন্সে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে বেরিয়ে পড়লেন । তিনি যখন যে দেশেই গিয়েছেন সেখানকার জ্ঞানী-গুণী-পন্ডিতদের সাথে নানান বিষয়ে আলোচনা করতেন । এতে একদিন যেমন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞানের প্রসার ঘটেছিল, অন্যদিকে তেমনি পন্ডিত দার্শনিক হিসাবে তাঁর খ্যাতি সম্মান একটু একটু করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল । কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে । দীর্ঘ দশ বছর ধরে প্রবাসে জীবন কাটিয়ে অবশেষে ফিরে এলেন এথেন্সে ।

মহান গুরুর মহান শিষ্য । ভ্রমর যেমন ফুলের সুবাসে চারদিকে থেকে ছুটে আসে দলে দলে, ছাত্ররা এসে ভিড় করল প্লেটোর কাছে । সক্রেটিস শিষ্যদের নিয়ে প্রকাশ্য স্থানে গিয়ে শিক্ষা দিতেন কিন্তু প্লেটো উন্মুক্ত কল-কোলাহলে শিক্ষাদানকে মেনে নিতে পারতেন না । নগরের উপকণ্ঠে প্লেটোর একটি বাগানবাড়ি ছিল, সেখানেই তিনি শিক্ষাকেন্দ্র খুললেন,এর নাম দিলেন একাডেমি । এই একাডেমির ছাত্রদের কাছেই প্লেটো উজাড় করে দিলেন তাঁর জ্ঞান চিন্তা মনীষা । তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল সিসিলি দ্বীপের শাসকদের আহ্বানে তিনি উপদেষ্টা হিসাবে সেখানে যান । তিনি চেয়েছিলেন সিসিলিকে এক আদর্শ রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করতে । দার্শনিকদের চিন্তাভাবনার সাথে রাষ্ট্রনেতাদের চিন্তাভাবনার কোনোদিনই মিল হয় না । তাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে এলেন এথেন্সে । তাঁর এই অভিজ্ঞতার আলোকে লিখলেন রিপাবলিক-এক আদর্শ রাষ্ট্রের রূপ ফুটে উঠেছে সেখানে । আসলে প্লেটোর আগে দর্শনশাস্ত্রের কোন শৃঙ্খলা ছিল না । তিনিই তাকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করলেন । তাকে নতুন ব্যন্জ্ঞনা দিলেন । তিনি জীবনব্যাপী সাধনার মধ্যে দিয়ে মানুষকে দিয়েছেন এক নতুন প্রজ্ঞার আলো । ইউরোপ তাঁকে বর্জন  করলেও আরবরা তাঁকে গ্রহণ করল ।আরব পন্ডিতরা তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করল । আবার চারদিকে প্রচারিত হল তাঁর আদর্শবাদ । ইউরোপের মানুষের চিন্তাভাবনা মনননের জগতে যে দুজন মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তাঁদের একজন প্লেটো, অপরজন অ্যারিস্টটল ।

প্লেটোর চিন্তাভাবনা তাঁর যুগকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে এক চিরকালীন সত্য । প্লেটোর চিন্তাভাবনার পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে । বিশ্ব সাহিত্যের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ । যদিও বই খানিতে মূলত রাষ্ট্রনীতির আলোচনা করা হয়েছে কিন্তু রাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনে এখানে নানান প্রসঙ্গ এসেছে । মানব জীবন এবং সমাজ জীবনে যা কিছু প্রয়োজন – শরীরচর্চা, শিল্পকলা, সাহিত্য, শিক্ষা, এমনকি সুপ্রজনন বিদ্যা – এছাড়াও কাব্য অলঙ্কার নন্দন তত্ত্ব এই বইয়ের অন্তর্ভূক্ত । প্লেটো রাষ্ট্রের নাগরিকদের তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন – (১) শাসক সম্প্রদায়, (২) সৈনিক, (৩) জনসাধারণ ও ক্রীতদাস ।

রাষ্ট্র তখনই সুপরিচালিত হয় যখন তিন বিভাগের কাজের মধ্যে সুসামঞ্জস্য বর্তমান থাকে এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে । তিনি বলেছেন শাসক সম্প্রদায়ের প্রয়োজন জ্ঞান, শাসন ক্ষমতা –সৈনিকদের চাই সাহস বীরত্ব, জনগণের প্রয়োজন সংযম ও শাসকদের প্রতি আনুগত্য । রাষ্ট্রের উন্নতি-অবনতি অনেকাংশে নির্ভর করে শাসকদের উপর । তাই প্লেটো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শাসক নির্বাচনের উপর ।

তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্র ক্ষমতায় কোন স্বৈরাচারীর স্থান নেই । “রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু জীবন ধারণের জন্য নয় । যতদিন মানুষ জীবিত থাকবে ততদিনই সে শ্রেষ্ঠ জীবনযাপন করবে ।” তাঁর রাষ্ট্রব্যবস্থায় উচ্চ-নীচের ভেদ থাকবে না, থাকবে পারস্পরিক সৌহার্দ ও প্রীতির সম্পর্ক । দি লস  গ্রন্থে তিনি বলেছেন, নগরবাসীরা সকলে পরস্পরকে জানবে বুঝবে । এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আর কিছুই হতে পারে না ।

সুপ্রজনন বিজ্ঞান- প্রাচীন গ্রীসের মানুষেরা সুস্থ সবল দেহের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিত । তারা দুর্বল অসুস্থ শিশুকে জীবিত রাখবার পক্ষপাতী ছিলেন না । প্লেটো এই অভিমত সমর্থন করতেন । তাই তিনি বলেছেন, যাদের শরীর ব্যাধিগ্রস্থ তাদের কোন সন্তান প্রজনন করা উচিত নয় । আপাত দৃষ্টিতে প্লেটোর অভিমত নিষ্ঠুর বলে মনে হলেও সামাজিক বিচারে তা একেবারে মূল্যহীন নয় । সংগীতের প্রতি প্লেটোর ছিল গভীর আকর্ষণ । তিনি বিশ্বাস করতেন সংগীত মানব জীবনকে পূর্ণতা দেয়, মানবিক গুণকে বিকশিত করে ।নারীদের প্রতি প্লেটোর ছিল গভীর শ্রদ্ধা । তাদের শিক্ষা সম্বন্ধে তিনি উদার নীতিতে বিশ্বাস করতেন । সেই যুগে অনেক মহিলাই পুরুষের যোগ্য সঙ্গিনী হয়ে উঠেছিলেন । তিনি মনে করতেন পুরুষেরা অহমিকাবশথ নারীদের উপেক্ষা করে । গ্রীসের পুরুষদের এই অহমিকা প্লেটোকে স্পর্শ করেনি । তিনি দেখেছেন বিভিন্ন গ্রীক মনীষীদের প্রেরণার উৎসই হচ্ছে নারী ।

একদিন তাঁর এক বন্ধুর ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন । সেখানকার কলকোলাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন । বিশ্রাম নেবার জন্য পাশের ঘরে গেলেন কিন্তু আনন্দ উল্লাসের শব্দ ক্রমশই বেড়ে চলছিল । উপস্থিত সকলেই ভুলে গিয়েছিল বৃদ্ধ দার্শনিকের কথা । একসময় বিবাহ শেষ হল । নব দম্পতি আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য প্লেটোর কক্ষে প্রবেশ করল । প্লেটো তখন গভীর ঘুমে অচেতন । পৃথিবীর কোন মানুষের ডাকেই সে ঘুম ভাঙাবে না ।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 16 =