নীড় / মনীষীর জীবনী / ৮৮. নিকোলাস কোপার্নিকাস

৮৮. নিকোলাস কোপার্নিকাস

৮৮. নিকোলাস কোপার্নিকাস

(১৪৭৩-১৫৪৩)

সভ্যতার আদি যুগ থেকেই মাটির মানুষ বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে থাকত আকাশের দিকে। আকাশের চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা সব কিছুই তার কাছে ছিল অপার বিস্ময়ের। বিজ্ঞানের কোন চেতনা তখনো মানুষের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেনি। তাই অনন্ত আকাশের মতই ছিল তার সীমাহীন কল্পনা। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে জন্ম নিতে থাকে জ্ঞানের চেতনা। কত প্রশ্ন জেগে ওঠে তার মনে। এই বিশ্ব প্রকৃতির অপার রহস্য ভেদ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জিজ্ঞাসু মন আর এই জিজ্ঞাসা থেকেই শুরু হল অনুসন্ধান। আকাশের রহস্যভেদের চর্চায় মানুষ কবে থেকে নিয়োজিত হল তার সঠিক কোন তারিখ নেই। তবে জ্যোতিবিজ্ঞানের চর্চা প্রথম শুরু হয়েছিল চীন দেশে। তবে তাদের উপলব্ধি বা গবেষণার বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

ব্যাবিলনের জ্যোতির্বিদরা প্রথম ঋতুর আবর্তন উপলব্ধি করে তারা এক বছর নির্ণয় করেন। তাদের হিসাবে ছিল ৩৬০ দিনে এক বছর হয়।

বিশ্ব প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে প্রথম যে মানুষটি আলোর পথ দেখান তাঁর  নাম পিথাগোরাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বর্তমান তুরস্কর অন্তর্গত ইজিয়ান সাগরের বুকে সামোস দ্বীপে তাঁর জন্ম হয়। জ্ঞানের আকষর্ণে তিনি কিশোর বয়সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। নানান দেশ ভ্রমণ করে মিশরে যান। সেখানকার পুরোহিতদের কাছে শিখেছিলেন জ্যোতিবিদ্যা ও জ্যামিতিশ্র। ইতালির ক্রোতনায় এসে তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুললেন। জ্ঞানের সাধনাতেই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মূলত অঙ্কশাস্ত্রবিদ হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তিনিই প্রথম উল্লেখ করেছিলেন- এই পৃথিবী ও গ্রহ আপন অক্ষের চারদিকে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু তাঁর এই অভিমতকে কেউ গ্রহণ করেনি।

তার পরে এলেন প্লেটো ও অ্যারিস্টটল। মানুষের জ্ঞান চিন্তা ভাবনার জগতে এক নতুন দিগন্তের দ্বারকে উন্মোচন করলেন। এর পাশাপাশি কিছু ধারণার কথা প্রকাশ করলেন যা মানুষের জ্ঞানের জগতে অন্ধকার যুগ নিয়ে এল। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটল কোন পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা ছাড়াই  একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর  ধারণা ছিল পৃথিবী স্থির। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা একই পথে আবর্তিত হচ্ছে। চাঁদের নিজস্ব আলো আছে। তাঁর এই মতবাদকে মানুষ অভ্রান্ত বলে মেনে নিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৩০ সালে অ্যারিস্টার্চ তাঁর অভিমত প্রকাশ করেন যে সূর্যই এই সৌরমন্ডলের কেন্দ্রবিন্দু এবং স্থির। কিন্তু এই অভিমতকে সকলেই অগ্রাহ্য করল।

পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নানান তত্ত্ব উদ্ভাবন করলেন।  তার এই সব তত্ত্বগুলিই ছিল ভুল। তিনি বললেন বিশ্ব একটা গোলক এবং তা গোলকের মতই ঘুরছে। পৃথিবীও একটি গোলাকার বস্তু এবং তা বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। পৃথিবী স্থির, সূর্যেই তার চারদিকে ঘুরছে। তাঁর এই অভিমতের সপক্ষে একটি মানচিত্রও অঙ্কন করেন। অ্যারিস্টটল ও টলেমির এই সব তত্ত্ব ও সূত্রগুলি প্রায় চোদ্দশো বছর ধরে মানুষ অভ্রান্ত সত্য বলে মেনে নিয়েছে, কেউ তার ভুলভ্রান্তি নিরুপণ করার চেষ্টা করেনি।

যীশুর জন্মের পরবর্তীকালে যখন বাইবেল রচিত হল, বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য সম্বন্ধে বাইবেলের রচনাকারদের সামনে টলেমির সিদ্বান্তগুলিই বর্তমান ছিল। তাই তাঁরা সেই সব অভিমতকেই বাইবেলের অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন। অল্প দিনের মধ্যে তা ধর্মের অঙ্গ হিসাবে পরিগণিত হল। পরবর্তীতে মানুষ বাইবেলের প্রতিটি কথাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিল। কারোর মনেই ছিল না কোন সংশয় বা জিজ্ঞাসা। এমনকি বৈজ্ঞানিকরাও বাইবেলকে অভ্রান্ত বলে মেনে নিল।

এর পেছনে আরো একটি কারণ ছিল ইউরোপের বুকে তখন চার্চের অপ্রতিহত প্রতাপ  একজন সম্রাটের মতই ছিল পোপের ক্ষমতা। অর্থ সম্পদ লোকজন কোর কিছুই কম ছিল না। একটি চার্চ হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা, ভন্ডামি আর সন্ত্রাসের কেন্দ্রভূমি। যে সব বিজ্ঞানী পন্ডিতরা চার্চ এবং বাইবেলকে মেনে চলত, তাদের নানাভাবে সাহায্য করা হত। কিন্তু যদি কখনো কেউ চার্চ বা বাইবেলের  বিরোধী একটি শব্দও উচ্চারণ করত তখন তাকে কঠোর হাতে দমন করা হত। কারাগারে পাঠান হত, নয়ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হত। ধর্মের আজ্ঞাবহ হয়ে বিজ্ঞান এক অন্ধকার যুগেই পড়ে ছিল। এই অন্ধকারের মধ্যেই অল্প কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এলেন। তাঁরা মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে, ধর্মের বন্ধনকে ছিন্ন করে প্রতিষ্ঠা করলেন নতুন সত্যকে। তাঁদের আবিস্কৃত সত্যের আলোয় বিজ্ঞান নতুন পথের সন্ধান পেল। এই সব মহান বিজ্ঞানীদের অগ্র পথিক যিনি তাঁর নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস।

১৪৭৩ সালের ১৪ ই ফেব্রয়ারি পোল্যান্ডের থর্ন শহরে কোপার্নিকাসের জন্ম। থর্ন বাল্টিক সাগরের কাছে ভিসটুল নদীর তীরে ছোট বন্দর শহর। বাবা ছিলেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী।

কোপার্নিকাসের পারিবারিক নাম ছিল নিকলাস কোপার্নিক। কোপার্নিক শব্দের অর্থ বিনয়ী। শুধু নামের নয়, আচার ব্যবহারে স্বভাবেও কোপার্নিকাস ছিলেন যথার্থই বিনয়ী।

ছেলেবেলা থেকেই কোপার্নিকাসের আকাশ গ্রহ নক্ষত্র্র সূর্য চন্দ্র তারা সম্বন্ধে ছিল গভীর কৌতূহল। এই সব বিষয়ে বাবা মাকে নানা প্রশ্ন করতেন। কিন্তু অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তরই জানা ছিল না ব্যবসাদার বাবার। কোপার্নিকাসের কাকা ছিলেন ধর্মযাজক পন্ডিত মানুষ। ভাইপোর জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ দেখে একটি বই পাঠিয়ে দিলেন। এই বইটি ছেলেবেলায় কোপার্নিকাসের সব সময়ের সঙ্গী ছিল।

১৫৪৩ সালে বইটি প্রকাশিত হল। তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। শোনা যায় যখন এই বইটি ছাপা অবস্থায় তাঁর কাছে এসে পৌছল তখন তাঁর পড়ে দেখবার মত অবস্থতা ছিল না। তিনি শুধু দুহাতে বইটি কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন, তাঁর কয়েক ঘণ্টা পরেই তাঁর মৃত্যু হল (১৫৪৩ সালের ২১ মে)। কোপার্নিকাস্‌ এই্ বইয়ের মধ্যে দিয়ে যে সত্যের প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁর উপর ভিত্তি করে গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন, আইনস্টান জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করলেন।

তিনি যে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিস্কার করেছিলেন তাই নয়, তিনি ইউরোপের প্রথম বিজ্ঞানী মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, অন্ধকার বিশ্বাসের মূলে তীব্র আঘাত হেনেছিলেন। তাই বিংশ শতকের মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসই হচ্ছেন আধুনিক যুগের পথিকৃৎ।

সম্বন্ধে ডলি খাতুন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × four =