নীড় / মনীষীর জীবনী / ৩১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
Napoleon_Bonaparte

৩১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

৩১. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
( ১৭৬৯-১৮২১)

ইতালির অন্তর্গত কর্সিয়া দ্বীপের আজাশিও নামে একটি ছোট শহরে বাস করতেন এক আইনজীবী, নাম চার্লস । তিনটি সন্তান তাঁর । চতুর্থ সন্তানের জন্মের সময় চিন্তিত হয়ে পড়লেন । স্ত্রীর শরীরের অবস্থা ভাল নয় । কিন্তু ঈশ্বরের আশীর্বাদে যথাসময়েই চার্লসের স্ত্রী চতুর্থ পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন । দাই এসে সংবাদ দিতেই ঘরে  ঢুকবেন চার্লস । নতুন কেনা গদির উপর শুয়ে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী আর নবজাত শিশুসন্তান । সমস্ত গদির উপর যুদ্ধের ছবি আঁকা । সেই দিন চার্লস কল্পনাও করতে পারেননি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে হবে তাঁর প্রতিষ্ঠা । যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই একদিন তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করবেন । আবার যুদ্ধই তাঁর ধ্বংসের কারণ চার্লসের সেই নবজাত শিশু সন্তান ( জন্ম ১৫ ই আগস্ট ১৭৬৯) ভবিষ্যতের বীর নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট । যে সমস্ত  মানুষ তাঁদের ব্যাক্তিত্ব, কৃতিত্ব, কর্মপন্থা, অপরিসীম সাহস ও শক্তি দিয়ে ইতিহাসের গতি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, নেপোলিয়ন  তাঁদের অন্যতম ।

চার্লস বোনাপার্ট ছিলেন সুদর্শন, প্রতিভাবান, আইনজীবী । বক্তা হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল । পুত্রদের  প্রাথমিক শিক্ষার সব ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন ।

শিশু নেপোলিয়ন দাদাদের সাথে পড়াশুনার অবসরে দ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তের ঘুরে বেড়াতেন । ভবিষৎ জীবনে নেপোলিয়নের চরিত্রে কর্সিয়ার প্রাকৃতিক প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ।
সেখানকার পাহাড়-পর্বতের মতই অনমনীয় দৃঢ়তা, শান্ত অটল প্রকৃতি নেপোলিয়নের জীবনে মূর্ত হয়ে উঠেছিল ।
নেপোলিয়নের মা ছিলেন উদার শান্ত প্রকৃতির মহিলা । বাবা-মার চারিত্রিক প্রভাবও নেপোলিয়নের জীবনকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল ।

নেপোলিয়নের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় তাঁর বাড়িতে পিতার কাছে । দশ বছর বয়সে একটি ফরাসী স্কুলে ভর্তি হলেন। প্রথমে কর্সিয়া ছিল জেনোয়ার অধিকারে । পরে এই দেশ ফরাসীরা দখল করে নেওয়ার ফলে কর্সিয়া ফরাসী অধিকারভুক্ত হয় । নেপোলিয়ন ফরাসী নাগরিক হিসাবে জন্মগ্রহণ করলেও ফরাসীদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন না । কারণ তাঁর মনে হত ফরাসীরা তাঁদের স্বাধীনতা হরণ করেছে ।

ছেলেবেলা থেকেই নেপোলিয়নের ইচ্ছা ছিল সৈনিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন । স্কুলের পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হলেন একটি সামরিক কলেজে । সামরিক শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুললেও ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ । তিনি প্লেটো, ভলতেয়ার, রুশো প্রভৃতি দার্শনিকদের রচনা গভীর মনোযোগ সহকারে পড়তেন, আলোচনা করতেন । তবে তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সেই সব দেশের সম্রাট রাজাদের বীরত্ব সাহস কীর্তি তাঁকে মুগ্ধ করত ।

তাঁর যৌবনে একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল কর্সিয়ার স্বাধীনতা অর্জন । তিনি বিশ্বাস করতেন একমাত্র সামরিক শক্তিতেই এই স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব । মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি ফরাসী সামরিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসাবে ভর্তি হলেন ।

এই সময় ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই-এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে বিপ্লব । রাজাকে পদচ্যুত করে দেশের ক্ষমতা দখল করল বিপ্লবী পরিষদ । তৈরি হল কনভেনশন বা প্রজাতান্ত্রিক ফরাসী সরকার । সমস্ত দেশ জুড়ে আরম্ভ হল হানাহানি মারামারি আর সন্ত্রাসের রাজত্ব । নিহত হল রাজা ষোড়শ লুই । ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্র ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল । এই সব দেশের সৈন্যদের একত্রিত করে তৈরি হল শক্তি সঙ্ঘ ।

ফরাসী বিপ্লব শুরু হওয়ার পর যখন নতুন শক্তি দেশের ক্ষমতা দখল করল, তারা ফরাসী অধিকারভুক্ত বিভিন্ন দেশকে স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসাবে ঘোষণা করে অভ্যন্তরীণ শাসনের পূর্ণ স্বাধীনতা দান করল । এই ঘোষনার ফলে নেপোলিয়নের মনে ফ্রান্সের প্রতি যে ঘৃণা ছিল তা সম্পূর্ণ  দূর হয়ে গেল ।

১৭৯৩ সালে ইউরোপের শক্তি সঙ্ঘের তরফে ইংরেজ নৌবাহিনী ফরাসী সামরিক বন্দর টুলো অবরোধ করল । সেখানকার স্থানীয় নাগরিকরাও রাজার সমর্থনে ইংরেজদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল ।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তখন ফরাসী  বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন, ইংরেজ বাহিনীর অবরোধ মুক্ত করবার ভার পড়ল তাঁর উপর । সসৈন্যে এগিয়ে গেলেন নেপোলিয়ন । দুপক্ষে শুরু হল তুমুল যুদ্ধ । ইংরেজ বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ফরাসীদের তুলনায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও নেপোলিয়নের সুদক্ষ রণনীতির সামনে তারা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়ে ফ্রান্স পরিত্যাগ করতে বাধ্য হল । এই জয়ে নেপোলিয়নের খ্যাতি সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল ।

যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য তাঁকে ফরাসী সামরিক বাহিনীর ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হিসাবে ঘোষণা করা হল । এর অল্প কিছুদিন পর মিথ্যা সন্দেহবশত নেপোলিয়নকে বন্দী করে কারারুদ্ধ করা হল । তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তিনি বিপ্লব বিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । অনুসন্ধানে এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হল ।

এই সময় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যে শক্তি সঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল, একে একে অনেক দেশ সেই সঙ্ঘ থেকে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন ফরাসী সরকারকে অস্বীকৃতি করে যুদ্ধ ঘোষণা করল । একদিকে বিদেশী শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা, অন্যদিকে দেশের মধ্যে নানান বিশৃঙ্খলা গন্ডগোল । এই অবস্থায় জনগণও বিপ্লবকে রক্ষা করবার জন্য ১৭৯৫ সালে কনভেনশন ডাইরেক্টরী নামে নতুন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল, এই কনভেনশন দেশের শাসনভার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করল । ফ্রান্সের সর্বময় কর্তা হিসাবে আইনসংগতভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেপোলিয়ন ঘোষণা করলেন, (১৭৯৯ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর ) “ বিপ্লবের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, এইবার বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটল ।”

ফ্রান্সের সাময়িক বিপর্যয়ের সুযোগ ইউরোপে গড়ে উঠল দ্বিতীয় শক্তি সঙ্ঘ । এই সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিল ইংলন্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া । তাদের একটি মাত্র উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সে নব গঠিত শাসন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা । ইউরোপের প্রতিটি দেশে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল । ফরাসী বিপ্লবের দ্বারা যেভাবে সে দেশের মানুষ ক্ষমতা অর্জন করেছে, তার প্রতিক্রিয়া তাদের দেশেও পড়তে পারে । একদিকে যেমন এই আশঙ্কা ছিল অন্যদিকে নেপোলিয়নের রণকুশলতায় সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছিল । তাই তাকে ধ্বংস করবার জন্য সম্মিলিতভাবে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তুলল ।

নেপোলিয়ন অনুভব করতে পেরেছিলেন এই সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এই মুহূর্তে অসুবিধাজনক । তাই তিনি ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী পিট ও অস্ট্রিয়ার রাজার কাছে সন্ধির প্রস্তাব করলেন । এর পেছনে তাঁর দুটি উদ্দেশ্য ছিল । তিনি সাময়িকভাবে যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে নিবৃত হতে চাইছিলেন । দ্বিতীয়ত যদি সন্ধির প্রস্তাব অগ্রাহ্য হয়, সেক্ষেত্রেও তিনি নিজের শক্তি বৃদ্ধি করবার সময় পাবেন ।

নেপোলিয়নের সন্ধির প্রস্তাব দুই তরফেই অগ্রাহ্য করা হল । মাত্র এক বছরের মধ্যে নেপোলিয়ন নিজের সৈন্যবাহিনীকে নতুন করে সুসংহত করে ইতালি আক্রমণ করলেন । অন্যদিকে তাঁর সেনাপতি অস্ট্রিয়া আক্রমণ করল । এই যুদ্ধের ফলে বিশাল অঞ্চল ফ্রান্সের অধিকারভুক্ত হল । তারা ফ্রান্সের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হল । এইভাবে দ্বিতীয় শক্তি সঙ্ঘের অবসান ঘটল ।

নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে প্রকৃতপক্ষে একনায়কতন্ত্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন । যে প্রজাতন্ত্রের জন্য ফরাসী বিপ্লব ঘটেছিল তার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল । এই ক্ষমতা দখল প্রসঙ্গে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “ফ্রান্সের রাজমুকুট মাটিতে পড়েছিল, আমি সেই মুকুট তরবারি দিয়ে মাথায় তুলে নিয়েছি ।”

নেপোলিয়নের বাস্তব বুদ্ধিবোধ এত প্রখর ছিল, তিনি গণভোটের আয়োজন করলেন, যাতে সর্বসমক্ষে প্রমাণিত হয়ে যায় তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েই সম্রাট পদে অভিষিক্ত হয়েছেন । তখন ফ্রান্সের জনগণের কাছে নেপোলিয়ন এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন সকলের ধারণা ছিল তিনিই ফ্রান্সের রক্ষাকর্তা । তাই নির্বাচনে সমগ্র জনগণের জনসমর্থন লাভ করে হয়ে উঠলেন ফ্রান্সের একচ্ছত্র অধিপতি ।

এইবার দেশের উন্নয়নের কাজে হাত দিলেন। দীর্ঘদিন বিপ্লবের উন্মাদনায়, যুদ্ধবিগ্রহের তান্ডবে প্রকৃতপক্ষে দেশের সমস্ত উন্নয়নের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভেঙে পড়েছিল  ।

নেপোলিয়ন দেশকে ৮৩ টি প্রদেশে ভাগ করে প্রতিটি প্রদেশ দেখাশুনার জন্যে একজন করে শাসক নির্বাচিত করলেন। সেই শাসকের উপর তার প্রদেশের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আরোপ করা হল । বিচার বিভাগের সংস্কার করলেন, নতুন বিচারক নিয়োগ করলেন। যাতে কোন দুর্নীতিগ্রস্ত লোক বিচারক হিসাবে নিযুক্ত হতে না পারেন সেই জন্যে বিচারক নির্বাচনের ভার নিজের হাতে নিলেন ।

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য তৈরি করা হল ‘ব্যাঙ্ক অব ফ্রান্স’ নামে জাতীয় ব্যাঙ্ক । এই ব্যাঙ্কের উদ্দেশ্য ছিল যাতে জনগণ, ব্যবসায়ীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ এখানে জমা রাখতে পারে, এবং শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যের প্রয়োজনে অর্থ ঋণ হিসাবে পেতে পারে ।

তিনি কর ব্যবস্থাকে সুবিন্যস্ত করলেন । এতদিন সরকারের তরফে কর আরোপ করা হত । লোকেরা সেই কর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জমা দিত না । কর আদায়ের ক্ষেত্রেও কোন সুষ্ঠু নীতি ছিল না । নেপোলিয়ন শুধু পুরনো নীতিকে নতুনভাবে বলবৎ করলেন না, জনগণ যাতে প্রবর্তিত কর ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে স্বেচ্ছায় কর দেয় তার জন্যে তাদের উৎসাহিত করতে লাগলেন । কর আদায়ের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হল । এর ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়া অর্থনীতি সজীব হয়ে উঠল ।

আইন বিচার অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে নগর উন্নয়নের দিকে নজর দিলেন নেপোলিয়ন । তৈরি হল নতুন রাস্তাঘাট শিক্ষাকেন্দ্র ।

তবে নেপোলিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত কাজ হল নতুন আইন বিধি যা  নেপোলিয়ন কোড নামে পরিচিত, তাকে প্রচলন করা ।

দেশের প্রচলিত আইন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম । সেই কারণেই দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞেদের পরামর্শে নতুন আইন বিধি গড়ে উঠল । এই সময় কাজের জন্য দেশের মানুষের গভীর আস্থা অর্জন করলেন নেপোলিয়ন । নেপোলিয়ন যতই তাঁর ক্ষমতা প্রভুত্ব বিস্তার করছিলেন, ততই বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না । তাই তিনি বলেছিলেন, আমিই বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি ।

সেই মুহূর্ত ফ্রান্সে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হল, সেই সময় ইংরেজদের সাথে আবার নেপোলিয়নের বিবাদ শুরু হল । ১৮০৫ সালে ইংরেজ নৌবাহিনী ফরাসী নৌবহরকে পরাজিত করল । নৌযুদ্ধ ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়ন তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করলেন । তিনি ইংরেজদের বলতেন ‘দোকানদারের জাত’ । ইউরোপের কোন বন্দরে যাতে ইংলন্ডের কোন পণ্য প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। এর ফলে শুধু ইংলন্ড নয়, অন্য দেশের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ল । ফলে ইউরোপের প্রতিটি দেশই নেপোলিয়নের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল ।

রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল । কিন্তু নেপোলিয়নের আচার-আচরণ মেনে নিতে পারছিলেন না রাশিয়ার জার । তিনি নিজের দেশের সমস্ত বনদর ইংলন্ডের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন এবং তাদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করলেন ।
রাশিয়ার এই আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন নেপোলিয়ন । তিনি স্থির করলেন রাশিয়া আক্রমণ করবেন । ছয় লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করা হল । এই বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে চললেন নেপোলিয়ন । এই রাশিয়া আক্রমণ নেপোলিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি ।
রাশিয়ার জার জানতেন নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীর মোকাবিলা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তাই রুশ বাহিনী ফরাসী সৈন্যদের আক্রমণ না করে পিছু হটতে আরম্ভ করল । শহর নগর গ্রাম যা কিছু ছিল সব নিজেরাই ধ্বংস করে দিল । ‍যুদ্ধক্ষেত্রে এই কাজকে বলে পোড়ামাটির নীতি । ফরাসী সৈন্যবাহিনী বিনা বাধায় মস্কোয় প্রবেশ করে শহর দখল করে নিল । জার তখন মস্কো ত্যাগ করে পিটাসবার্গ দুর্গে অবস্থান করেছিলেন । নেপোলিয়ন মস্কো জয় করার অল্পদিনের মধ্যেই শীত এসে গেল । রাশিয়ার ভয়াবহ ঠান্ডা সহ্য করবার ক্ষমতা ছিল না ফরাসী সৈন্যদের । তারা ফিরে চলল ফ্রান্সের দিকে । তখন বরফ পড়তে আরম্ভ করেছে । নিজেদের সঞ্চিত খাবার ফুরিয়ে গিয়েছে । পথের কষ্টে শত শত সৈনিক মারা পড়তে আরম্ভ করল । তাদের দুর্বলতার সুযোগে রুশ সৈন্যবাহিনী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ফরাসীদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ শুরু করল । তার সাথে রুশ গোলন্দাজ  বাহিনীর আক্রমণে ফরাসী সৈন্যবাহিনীর প্রায় সমস্ত সৈন্যই মারা পড়ল । ছয় লক্ষ সৈন্যের মধ্যে মাত্র বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে ফ্রান্সে এসে পৌঁছেলেন নেপোলিয়ন ।

তাঁর এই পরাজয়ে ইউরোপের সমস্ত দেশ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল । এই বিশাল শক্তির সাথে লড়াই করবার ক্ষমতা ছিল না নেপোলিয়নের । রাশিয়া আক্রমণের ফলে তাঁর সৈন্য সংক্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল । বিরোধী পক্ষের আক্রমণের মুখে পিছু হটতে আরম্ভ করলেন । বিরোধী পক্ষ চারদিক থেকে প্যারিস অবরুদ্ধ করে ফেলল । নেপোলিয়নের সৈন্যরাও তাঁকে ত্যাগ করল । নিরুপায় নেপোলিয়ন ১৮১৪ সালের ১১ই এপ্রিল সিংহাসন ত্যাগ করলেন । তাঁকে এলবা দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হল ।

নেপোলিয়নের অবর্তমানে সিংহাসনে বললেন ফ্রান্সের বুরবোঁ পরিবারের অষ্টাদশ লুই । সাথে সাথে অভিজাত সম্প্রদায় দেশ ফিরে এল । দেশে নতুন করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল । ফরাসী জনগণ কিছুতেই এই নতুন শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারছিল না । ফরাসী সৈন্যবাহিনীও নেপোলিয়নকে আদর্শ বীর হিসাবে মনে করত । দেশের মধ্যে গোলযোগ শুরু হল ।

এলবা দ্বীপে অবস্থানকালে ফ্রান্সের এই অবস্থার কথা শুনে গোপনে দেড় হাজার সৈন্য নিয়ে নেপোলিয়ন প্যারিসে এসে উপস্থিত হলেন । এই সংবাদ পেয়ে রাজা লুই তাঁর সৈন্যবাহিনীকে পাঠালেন নেপোলিয়নকে বন্দী করবার জন্য । সৈন্যবাহিনী এসে যখন চতুর্দিকে তাদের সামনে এসে বললেন, তোমরা যদি আমাকে হত্যা করতে চাও, তবে স্বচ্ছন্দ মনে তা করতে পার । আমি তোমাদের সম্রাট, তাই তোমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি । তাঁর এই ব্যক্তিত্ব, সাহস, আকর্ষণীয় শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে সৈনিকরা লুই এর পক্ষ ত্যাগ করে তাঁকে সমর্থন করল । ফরাসী সেনাপতি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে নেপোলিয়নের পক্ষে যোগ দিলেন ।

অবশেষে ২২ শে জুন নেপোলিয়ন পদত্যাগ করে প্যারিস ত্যাগ করলেন । কারণ সম্মিলিত বাহিনী প্যারিসের দ্বরপ্রান্তে এসে পড়েছে । তিনি জানতেন ধরা পড়লে সাথে সাথে তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে ।

তিনি তাঁর প্রথম রানী জোসেফাইনের প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় নিলেন । সেখানে ছিল তাঁর পালিত কন্যা । দুজনে আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া স্থির করলেন । কিন্তু তাঁকে নিয়ে যাবার জন্য কোন জাহাজই এল না । সম্মিলিত বাহিনীর নেতারা তাঁকে সুদূর আফ্রিকার এক দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন দিল । সেখানে ব্রিটিশ গভর্নরের অধীনে জীবনের অবশিষ্ট ছটি বছর কাটাতে হল ।

১৮২১ সালের ৫ ই মে বায়ান্ন বছর বয়সে ক্যানসার রোগে তাঁর মৃত্যু হল ।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর খাঁচায় পোষা পাখির মত বন্দী জীবনে প্রাণত্যাগ করলেও তিনি ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পুরুষ ।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 6 =