নীড় / মনীষীর জীবনী / ৯৬. মার্টিন লুথার কিং
G68WBR Civil Rights Movement - Martin Luther King - Heathrow Airport, London

৯৬. মার্টিন লুথার কিং

৯৬. মার্টিন লুথার কিং

[১৯২৯-১৯৬৮]

“আমেরিকার এই গান্ধী আবির্ভূত হয়েছিলেন এক শ্রান্ত মায়ের ক্লান্ত পা দুখানির দিকে তাকিয়ে।”১৯৫৫ সালের ১লা ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার আমেরিকার মন্টগোমারি শহরের সিটি লাইন্সের বাস চলেছে। বাসের সব আসন পূর্ণ। সামনের দিকে বারোজন শ্বেতাঙ্গ, পেছনে চব্বিশজন নিগ্রো। মার্কিন দেশের দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্যেই বাসের সামনের দিকে বসবার অধিকার নেই নিগ্রোদের। সমস্ত বাসই সংরক্ষিত থাকে শ্বেতাঙ্গদের জন্য।

কলেজ থেকে পাশ করবার পর ১৯৪৮ সালে ১৯ বছর বয়সে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারিতে ভর্তি হলেন। এ এক ভিন্ন পরিবেশ।

এখানে শ্বেতাঙ্গ ও নিগ্রো ছাত্ররা একই সাথে পড়াশুনা করত, কোন বর্ণবৈষম্য ছিল না। পড়াশুনায় বরাবরই মনোযোগী ছাত্র ছিলেন কিং। এখানে ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তকের সাথে দেশ-বিদেশের দার্শনিকদের রচনাবলী পড়তে আরম্ভ করলেন। পড়লেন বিভিন্ন দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। তবে যাঁর জীবন রচনা তাঁর মনকে অধিকার করে নিল তিনি ভারতের মহাত্মা গান্ধী। তিনি বলতেন, নাজারেথের যীশু আর ভারতের গান্ধী আমার জীবনসর্বস্ব। যীশু পথ দেখিয়েছেন, গান্ধী প্রমাণ করেছেন সেই পথ পাঠ আমি পেয়েছিলাম বাইবেল ও খ্রীস্টের জীবন আর উপদেশের মধ্যে। আর এই প্রতিরোধের পদ্ধতিটি পেয়েছিলেন গান্ধীর কাছ থেকে। ক্রোজার থিওলজিক্যাল সেমিনারি থেকে স্নাতক হওয়ার পথ তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্বে ডক্টরেট ডিগ্রি পান। ডিগ্রি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় তাঁর জীবনে আরো একটি প্রাপ্তি ঘটেছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের ছাত্রী ছিলেন কোরেত্তা স্কট নামে একটি তরুণী। কিং- এর সাথে প্রথম পরিচয়ে মুগ্ধ স্কট। অল্পদিনের মধ্যেই দুজনে পরস্পরের আবদ্ধ হলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ডেক্সর্টার এ্যাভিনিউয়ের ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক ‍হিসাবে যোগদান করলেন।

ছাত্র অবস্থা থেকেই নিগ্রো আন্দোলনের প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। ধর্মযাজক হিসাবে যোগদান করবার পর থেকে তিনি সরাসরি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। সেই সময় নিগ্রোদের প্রধান সংগঠন ছিল National Association for the Advancement of Coloured People (N A A C P)। এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিং-এর দাদু। সেই সূত্রে এবং নিজের ব্যক্তিত্বের অল্পদিনের মধ্যেই এই এ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন কিং।

১৯৫৫ সালে মন্টগোমারিতে শুরু হল ঐতিহাসিক বাস ধর্মঘট। সমস্ত নিগ্রোদের তরফে দাবি তোলা হল (১) বাসে নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যে বৈষম্য আছে যে প্রত্যাহার করতে হবে,(২) বাসে যে আগে উঠবে সে আগে বসবে, (৩) নিগ্রোদের সাথে ভদ্র ব্যবহার করতে হবে, (৪) নিগ্রো এলাকা দিয়ে যে সব বাস চলাচল করে সেই সব বাসের ক্ষেত্রে নিগ্রো ড্রাইভার নিযুক্ত করতে হবে।

নিগ্রোদের সমর্থনে এগিয়ে এলেন নিগ্রো খ্রীস্টান ধর্মযাজকরা। প্রতিষ্ঠা হল মন্টগোমারি ইমপ্রুভমেন্ট এ্যাসোসিয়েশন। মার্টিন লুথার কিংও এর সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তিনি এক প্রকাশ্য সমাবেশে সমস্ত নিগ্রোদের উদ্দেশ্যে বললেন যতদিন না মন্টগোমারি বাস কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের দাবি না মেনে নেওয়া হচ্ছে ততদিন একটি নিগ্রোও বাসে উঠবে না।

প্রায় এক বছর নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিগ্রোরা সমস্ত সরকারী বাস বয়কট করে। কর্তৃপক্ষ বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত নিগ্রোদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেন। সুপ্রীম কোর্ট বাসের এই বর্ণবিদ্বেষী ব্যবস্থাকে সংবিধান বিরোধী বলে ঘোষণা করল। অবশেষে M I A-এ সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হল। বাসে নিগ্রোদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল।

এই জয়ের পেছনে কিং-এর অবদান ছিল বিরাট। তিনি নিগ্রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গরা সোচ্চার হয়ে ওঠে। তাঁকে নানাভাবে ভয় দেখানো হতে থাকে। এমনকি একদিন তাঁর বাড়িতে বোমা ফেলা হল। কিন্তু কোন কিছুর কাছেই মাথা নত করলেন না কিং। পুলিশ নানাভাবে তাঁকে বিব্রত করতে থাকে। এমনকি তিনি নিগ্রোদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে তাঁকে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তাঁকে আদালত থেকে ছেড়ে দেওয়া হল। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নিগ্রোদের কাছে হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন শাস্তি আর অহিংসায়। তিনি অন্তরে অনুভব করতেন ন্যায় ও সত্যের সপক্ষে যে সংগ্রাম আরম্ভ করেছেন তা ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই করছেন। শ্বেতাঙ্গরা তাঁকে বিদ্রূপ করে বলত নিগ্রো ধর্মগুরু।

মন্টগোমারির বাস আন্দোলনে এই গৌরব-উজ্জ্বল ভূমিকায় কি-এর নাম ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত আমেরিকায়। তাঁর এই অহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতো এগিয়ে এল বহু নিগ্রো নেতা। সমস্ত আমেরিকা জুড়েই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জেগে উঠতে থাকে।

১৯৫৭ সালে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশের নিগ্রো নেতৃবৃন্দ এবং তাছাড়া বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকারের নিগ্রো মন্ত্রীরা মিলিত হলেই আটলান্টা শহরে। নিগ্রোদের সামাজিক ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরো জোরদার করবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হল Southern Christian Leadership Conference. সংক্ষেপে বলা হল S.C.L.C.। মার্টিন লুথার ও আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এখানে দুই নেতার মধ্যে সাক্ষাৎ হল। নিক্সন নিগ্রোদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এক বছর পর রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে মিলিত হলেন কিং  অন্যসব নিগ্রো নেতারা। বেশ কয়েকবার আলোচনা বৈঠক বসবার পরেও কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভবপর হল না। সরকারের অধিকাংশ প্রস্তাবই তাঁদের সপক্ষে মনোমত হল না। কি-এর ভাষায় This is no real or meaningful settlement.

দেশের মধ্যে শ্বেতাঙ্গদ আচরণে ক্রমশই বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল। শুধুমাত্র সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, আইনগত ক্ষেত্রেও নানাভাবে নিগ্রোদের বঞ্চনা করা হত। বহু রাজ্যে নিগ্রোদের কোন ভোটাধিকার ছিল না। সরকারী উচ্চপদে বসবার অধিকার ছিল না নিগ্রোদের। কিং আমেরিকার প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে প্রচার করতে লাগলেন, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংসা আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য সমস্ত নিগ্রোদের কাছে আহ্বান জানাতে থাকেন। ধীরে ধীরে প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই আন্দোলন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। কিং হয়ে উঠলেন সমস্ত আমেরিকার নিগ্রো মানুষের অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জহরলালের আমন্ত্রণে ভারতবর্ষে এলেন কিং ও তাঁ স্ত্রী। ভারতবর্ষ কিং-এর কাছে ছিল এক মহান দেশ। তিনি মহাত্মা গান্ধীর জন্মস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন।

কিং ভারত ভ্রমণ শেষ করে যখন আমেরিকায় ফিরে এলেন, আমেরিকা জুড়ে আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। নিগ্রোর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলেও শ্বেতাঙ্গরা হিংস্র হয়ে ওঠে। নিগ্রোদের মধ্যে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। তারাও পালটা আক্রমণ শুরু করে। সর্বত্রই ভাঙচুর লুঠতরাজ গুলি লাঠি চলতে থাকে। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর সমস্ত অভিযোগ এসে পড়ে।

১৯৬৫ সালে আমেরিকা ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। শান্তির পূজারী কিং ‍ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে। ভিয়েৎনামের মত একটি ছোট দেশের উপর আমেরিকার এই আক্রমণকে মেনে নিতে পারলেন না কিং। দেশ জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিগ্রোদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর শ্বেতাঙ্গরা হিংস্রভাবে আক্রমণ করছিল। নিগ্রোরাও এর বিরুদ্ধে পালটা আক্রমণ শুরু করল। সর্বত্রই অহিংস সত্যাগ্রহ হিংসাত্মক আন্দোলনে পরিণত হল। এতে ব্যথিত হতেন কিং। তিনি বার বার সকলকে শান্ত সংযত থাকবার জন্য আহ্বান জানাতেন। আমেরিকা ক্রমশই ভিয়েৎনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বের বহু বুদ্ধিজীবী মানুষের সাথে কিংও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিরোধী পদযাত্রা করবার আহ্বান জানালেন আমেরিকার সমস্ত শান্তিকামী মানুষকে। এরই সাথে তিনি ঘোষণা করলেন ২৭শে এপ্রিল দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করবার জন্য আর্থিক নিরাপত্তার দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত দরিদ্র মানুষদের সাথে নিয়ে তিনি ওয়াশিংটন অভিযান করবেন। শান্তি অভিযানে সেদিন হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল শান্তির আহ্বান।

মেমপিস টেনেসি রাজ্যে নিগ্রো পৌরকর্মীরা শ্বেতাঙ্গদের সমান মাইনে ও কাজের সুযোগ-সুবিধা বাড়াবার জন্য আন্দোলন করছিল। কিং সেখানে গেলেন। কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের একটি দাবিও মেনে নিলেন না। কিছু অল্পবয়সী ছেলে এর প্রতিবাদে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল। পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন মারা পড়ল।

৩রা এপ্রিল কিংকে হত্যার হুমকি দেওয়া হল। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে অন্যত্র চলে যেতে বললেন। কিন্তু অকুতোভয় কিং বললেন তাঁর যাই ঘটুক না কেন তিনি এখান থেকে যাবেন না। সকলকে হিংসা ত্যাগ করবার আহ্বান জানালেন। পরদিন তিনি যখন হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আততায়ীর বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। সন্ধ্যে সাতটায় চিরশান্তির প্রতীক মার্টিন লুথার কিং তার আদর্শ খ্রীস্ট, গান্ধীর মতই হিংস্র মানুষের হিংস্রতার কাছে আত্মাহুতি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তখন তিনি ঊনচল্লিশ বছরের এক যুবক।

 

সম্বন্ধে ডলি খাতুন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × five =