নীড় / মনীষীর জীবনী / ৪০ মাও সে তুং
Mao-tse-tung

৪০ মাও সে তুং

৪০.মাও সে তুং
(১৮৯৩-১৯৭৬)

১৮৯৩ সালের ২৬শে ডিসেম্বর চীনের হুনান প্রদেশেরে এক গ্রামে মাও জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন। চাষবাসই ছিল তার প্রধান পেশা।

শেশবে গ্রামের স্কুলেই পড়াশুসা করতেন। পড়াশুনার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। পাঠ্যসূচির বাইরে যখন যে বই পেতেন তাই পড়তেন। তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ণ করত চীনের ইতিহাস, বীর গাথা।

তিন ভই ও এক বোনের মধ্যে মাও ছিলেন সবচেয়ে বড়। পরে তার দুই ভাই কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত হয়। গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে কিছুদিন গ্রামেই পড়াশুনা করলেন। প্রায় জোর করেই বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে হুনানসের প্রাদেশিক শহরে এলেন। ভর্ হলেন এখানকার হাই স্কুলে। এই সময় নিয়মিত স্থানীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়াশুনা করতেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি লাইব্রেরীর অর্কের বেশি বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন।

১৯১৮ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্ গড়ে  উঠল। এর ৫০ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে মাও-ও ছিলেন।

ইতপিূর্ মাও বেশ কিছু রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় চীনের সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বের কুয়োমিংতাং দল অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। চীনা কমিউনিস্ট দল () এবং কুয়োমিংতাং () এর মধ্যে সংযুক্ত ঐক্য গড়ে উঠল।

রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্র তরফে এই ঐক্যকে সমর্ন জানানো হল। চিয়াং কাইশেক গেলেন মস্কোতে। সেখানে তাকে সাই ইয়াৎ সেনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করা হল। ইতিমধ্যে

মাও বিবাহ তরেছেন তার এক শিক্ষকের কন্যাকে-ইয়াং কাই হুই। হুই পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়র চাত্রী অবস্থাতেই কমিউনেস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই সূত্রেই দুজনে নিকট সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৩০ সালে আন্দোলনের কাজে জড়িত থাকার সময়েই নিহত হন হুই। ….. এবং ….. দুই রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেও অল্পদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রভেদ প্রকট হয়ে উঠল। মাও- এর উপর ভার ছিল এই দুটি দলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা।

চীন ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ। দেশের শতকরা আশি জন মানু্ষই চিল কৃষিনির্র। তৈরি হল জাতীয় কৃষক আন্দোলন সংগঠন। এই সংগঠনের পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল মাও-এর উপর।

অল্পদিনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্ এবং মাও-এর সামনে এক সংকট দেখা দিল। মাও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলেন গতানুগতিক পথে নয়, কৃষকদের মধ্যে থেকেই বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। ১৯২৭ সালে তিনি হুনানের কৃষক আন্দোলনের উপর এক বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে পাটি নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানালেন, অবিলম্বে দেশ জুড়ে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা হোক। দলের অধিকাংশেরই এ ব্যাপারে সম্মতি ছিল না। তারা কৌতুক করে বলত ‘গেঁয়োদের আন্দোলন’। মাওয়ের প্রস্তাব সমথিত হল না । তা সত্ত্বেও দলে মধ্যে বেশ কিছু সদস্য এর সমথনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এল।

১৯২৮ সাল নাগাদ তার সাহায্যে কৃষক নেতা চু তে বিরাট বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলেন। চু মাও-এর নীতিতে বিশ্বাস করতেন। এই সময় কমিউনিস্ট পাটির অধিকাংশ সদস্যই আত্মগোপন করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তাদের কাযদারা এতখানি সীমিত হয়ে পড়েছিল, মাও হয়ে উঠলেন কমিউনিস্ট পাটির অন্যতম পুরোধা।

মস্কোতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পাটির আন্তজাতিক সম্মেলনে স্টালিন মাও-এর বিপ্লবী প্রচেষ্টাকে সমর্ন জানালেন। তাকে আবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যেোর সদস্য হিসেবে নিবাচিত করা হল। চিয়াং কাইশেক তার বাহিনীকে আদেশ দিলেন কমিউনিস্টদের সমূলে বিনাশ করতে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালে মধ্যে চারবার বিশাল বাহিনী পাঠানো হল বিদ্যোহীদের দমন করবার জন্য। এই  বাহিনী চিল সম্পূন আধুসিক অন্ত্রশস্ত্রে সজ্জ্তি তবুও তারা জয়লাভ করতে পারেনি। এ পাহাড় অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল সৈন্যদের অগম্য কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ মাও-এর লাল ফৌজের অদম্য মনোবল এবং শৃঙ্খলাবোধ। লাল ফৌজের সাফল্যের পেছনে আরো একটি বড় কারণ ছিল স্থানীয় মানুষের সহায়তা।

চিয়াং অনুভব করতে পারছিলেন এর সুদূর প্রসারিত প্রতিক্রিয়া। তাই জামান সামরিক উপদেষ্টাদের পরামশ মত পঞ্চমবার প্রায় এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন।

সামরিক বাহিনী বীরদপে এগিয়ে চলল। এই সুসজ্জিত বাহিনীর প্রতিরোধ করা সম্ভবপর চিল না মাও-এর লাল ফৌজের। তারা ক্রমশই পিছু হটতে আরম্ভ একের পর এক মুক্ত অঞ্চল অধিকৃত হতে থাকে চিয়াং কাইশের বাহিনীর।

লাল ফৌজ পিছু হটতে হটতে এসে কিয়াংসাই পাবত্য প্রদেশে। এই স্থান প্রশিক্ষণের উপযুক্ত বিবেচনা করে মাও উত্তর-পশ্চিমে বিখ্যাত চীনের প্রাচীরের কাছে এসে আশ্রয় নিলেন।না।

১৯৩৪ সালের অক্টোবরে লাল ফৌজের শুরু হল ঐতিহাসিক অভিযান। এই অভিযান সহজসাধ্য ছিল না। পথের অবণনীয় দুঃখ-কষ্টেও লাল ফৌজের মনোবল এতটুকু ভেঙে পড়েনি। প্র্রত্যেকেই ছিল মাও-এর বিপ্লবী চেতনায় ‍ুদ্বুদ্ধ। অবশেষে অক্টোবর ১৯৩৫ সালে তারা এসে পৌঁছল উত্তরের সেনসি প্রদেশে। এখানেরই শিবির স্থাপন করলেন মাও। ইতমিধ্যে আরো বহু তরুণ কৃষক শ্রমিক এসে যোগ দিয়েছে লাল ফৌজে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হল্ বিস্তুত অঞ্চল জুড়ে আবার গড়ে উঠল মুক্ত স্বাধীন শাসনব্যবস্থা।

এই সময় একজন আমেরিকান সাংবাদিক এডগার স্নো বহু কষ্টে চীনা কমিউনিস্ট ঘাটিতে গিয়ে পৌঁছান। তার এই অভিজ্ঞতার কথা পরবতীকালে বিবরণ দিয়েছেন তার বিখ্যাত ‘‘চীনের আকাশে লাল তারা” () বইতে। মাও সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন “যেমন মজার তেমনি গম্ভীর দুবোদ্য প্রকৃতির মাসুষ। তার মধ্যে জ্ঞান আর কৌতুকের এক আশ্চয সমন্বয় ঘটেছে। নিজের অভ্যেস পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে যতখানি উদাসীন, নিজের দায়িত্ব কতব্য সম্বন্ধে ততখানিই সজাগ। কি অফুরন্ত প্রাণশক্তি, রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল নিধারণের ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভাধর।”

মাও অনুভব করতে পেরেছিলেন জাপানী আক্রমণের বিপদ। তাই কুয়োমিংতাং-এর সাথে ইতিপূবে তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে জাপানীদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।

ইতিমধ্যে পৃথিবী জুড়ে শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। পরাজিত হল জাপানের সৈন্যবাহিনী। কিন্তু বিপ্লবের আগুন নিভল না। লাল ফৌজ তখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রান্তে প্রান্তে। চিয়াং কাইশেক উপলব্ধি করতে পারছিলেন মাও-এর নেতৃত্বে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে তাকে ধ্বংস করবার মত তার ক্ষমতা নেই। তাই আমেরিকার সাহায্য প্রার্ হলেন। কিন্তু আমেরিকান মদতপুষ্ট হয়েও নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না চিয়াং কাইশেক। লাল ফৌজের সৈন্যবাহিনী চারদিক থেকে পিকিং শহর ঘিরে ফেলল। আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাহায্যে চিয়াং পালিয়ে গেলেন ফরমোসা দ্বীপে। ১লা অক্টোরর ১৯৪৯ সালে লাল ফৌজ পিকিং দখল করে নিল। নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হল। তার চেয়ারম্যান হিসেবে নিবাচিত হলেন পঞ্চান্ন বছরের মাও সে তুং। সমাপ্ত হল তার দীঘ সংগ্রাম। কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল মানুষের মন থেকে বিপ্লবের উন্মাদনা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। হ্রাস পাচ্ছে মাও-এর জনপ্রিয়তা।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলেছিল ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পযন্ত। এর পরবতীতে চীনে রাষ্ট্রনৈতিক ও সমাজ জীবনে বিরাট পরিবতন দেখা গেল। প্রকৃতপক্ষে এতদিন পযন্ত চীন নিজেকে বিশ্বের সমস্ত দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। এই বার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পক গড়ে তুলল। ইউরোপে পাঠানো হল বাণিজ্য প্রতিনিধি দল। বিদেশীদের দেশে আসবার অনুমতি দেওয়া হল। যে রাষ্ট্রসঙ্ঘের অস্তিত্বকে চীন অস্বীকার করেছিল দীঘদিন, ১৯৭১ সালে তার সদস্য পদ গ্রহণ করল।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিশেষত কৃষিক্ষেত্রে চীন অন্তভূতপূব উন্নতি লাভ করে। সবক্ষেত্রেই ছিল মাও-এর অবদান। কয়েক শো বছরের শোষিত বঞ্চিত দরিদ্র অবক্ষয়ের অন্ধকার ডুবে যাওয়া একটি জাতিকে তিনি দেখিয়েছিলেন আধুনিকতার আলো।

মাওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি স্টালিনের মতই সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। কমিউনিস্ট বিরোধীদের নিমমভাবে ধ্বংস করেছিলেন। বিপ্লব উত্তরকালে দেশে যখন শান্তি শৃঙ্খলা সুস্থিরতার প্রয়োজন, মাও অনাবশ্যকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কোরিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ, তিব্বত দখল, ফরমোসা সংক্রান্ত বিবাদ, ভারত আক্রমণ, রাশিয়ার সাথে বিবাদ। মাও ভেবেছিলেন বিপ্লবের সময় যেভাবে গণজাগরণ ঘটাতে সমর্ হয়েছিলেন, উত্তরকালেও তা বতমান থাকবে। মাও বিশ্বাস করতেন এক অন্তহীন বৈপ্লবিক সংগ্রাম। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি প্রত্যেক বিপ্লবী উত্তরকালে হয়ে ওঠে সংশোধনবাদী নয়তো ক্ষমতালিপ্সু । তাই তার অজান্তেই দেশে গড়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধ শক্তি। যারা মাও-এর বাধক্যের সুযোগ নিয়ে প্রকৃত রাষ্ট্রক্ষমতা চালিত করত। তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে মাও মারা গেলেন। ‘গ্যাং অব ফোর’ নামে চারজনের একটি দলকে বন্দী করা হল। এদের মধ্যে ছিলেন মাও-এর বিধবা পত্নী। প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অভিযোগ উঠেছিল।

ব্যক্তি জীবনের দোষত্রুটি বাদ দিলে মাও ছিলেন এমন একজন মাসুষ যিনি আজন্ম বিপ্লবী। তিনি বিশ্বাস করতেন একমাত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র পূণতা লাভ করতে পারে। আর এই বিশ্বাসের শক্তিতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যাবহুল রাষ্ট্রের।

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + twelve =