নীড় / মনীষীর জীবনী / ১৩. লিও তলস্তয়
leo-tolstoy

১৩. লিও তলস্তয়

১৩.  লিও তলস্তয়
(১৮২৮-১৯১০)

এই মহান রুশ মনীষী, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, মানবতাবাদী তলস্তয়ের জন্ম হয় ১৮২৮ সালের ২৮ শে আগস্ট(৯ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে । বাবা-মা দুই দিক থেকেই তলস্তয় ছিলেন খাঁটি অভিজাত । তলস্তয়ের বাবা নিকোলাস ছিলেন বিশাল জমিদারির মালিক ।

লিও তলস্তয় ছিলেন তাঁর পিতামাতার চতুর্থ পুত্র । তাঁর জন্মের এক বছর পরেই তাঁর মা মারা গেলেন । তাঁর দেখাশোনার ভার ছিল এক ফুফুর উপর ।

পাঁচ বছর বয়সে বাড়িতেই শুরু হল তাঁর পড়াশুনা, একজন জার্মান শিক্ষক তাঁকে পড়াতেন ।
যখন তাঁর আট বছর বয়স, ভাইদের সাথে তাঁকে পলিয়ানার গ্রাম্য পরিবেশ ছেড়ে যেতে হল মস্কোতে ।
বেশিদিন তাঁকে মস্কোতে থাকতে হল না । এক বছর হঠাৎ নিকোলাস মারা গেলেন ।তাঁদের অভিভাবিকা হলেন ফুফু । বড় দুই ভাই মস্কোতে রয়ে গেল, তলস্তয় ফিরে গেলেন ফুফুর কাছে পলিয়ানায় । বাড়িতে শিক্ষক ঠিক করা হল । তাঁর কাছেই শিখতে আরম্ভ করলেন জার্মান আর রুশ ভাষা ।
আবার নতুন করে সৃষ্টির কাজে হাত দিলেন তলস্তয় ।এই পর্যায়ে তিনি লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কিছু ছোট গল্প । মানুষ কি নিয়ে বাঁচে, দুজন বৃদ্ধ মানুষ যেখানে ভালবাসা সেখানেই ইশ্বর, বোকার ইভানের গল্প, তিনজন সন্ন্যাসী, মানুষের কতটা জমি প্রয়োজন, ধর্মপুত্র-এই গল্পগুলির মধ্যে একদিকে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা অন্যদিকে সৎ সরল জীবন পথের নির্দেশ । এক অসাধারণ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে প্রতিটি গল্পে । পাঠকের হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে তা স্পর্শ করে ।  পরবর্তীকালে এই গল্পগুলি সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয় ২৩ টি গল্প (১৯০৬) ।

১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হল তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত উপন্যাস ক্রয়োজার সোনেটা । তখন তলস্তয়ের বয়স ছিল ৬১ বছর । এতে লিখলেন এক বৃদ্ধ কি প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণায় ঈর্ষাপ্রণোদিত দ্বিচারীণী স্ত্রীকে হত্যা করেছিল । এই রচনা প্রকাশের সাথে সাথে চারিদিকে বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল । নিন্দা বিদ্রুপ আর কটূক্তিতে ছেয়ে গেল চারদিক — সমালোচনা করা হল এক বিকৃত যৌনতা ফুটে উঠেছে এর মধ্যে । লেখক সমস্ত সমাজ সংসারক ধ্বংস করবার কাজে নেমেছেন । নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এই বই । কিন্তু তার আগেই হাজার হাজার কপি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র ।
সোভিয়েত রাশিয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিল । হাজার হাজার মানুষ অনাহারক্লিষ্ট দুদর্শার মধ্যে দিন কাটাতে লাগল । দেশের সরকার এই ঘটনায় সম্পূর্ণ উদাসীন  হয়ে রইলেন । কিন্তু তলস্তয় গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন । লন্ডনের ডেলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সরকার তার আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বললেন,দেশের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী বর্তমান প্রশাসন, তাঁর এই সমালোচনার ফলে রুশ দেশের প্রকৃত ছবি পৃথিবীর সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ল ।
ক্ষোভে ফেটে পড়ল জারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা । সকলে বুঝতে পারল রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে এই বার তলস্তয়কে বন্দী করা হবে ।
কিন্তু জার গ্রেফতারের অনুমতি দিলেন না ।
দুর্ভিক্ষের বিবাদ মিটতে না মিটতেই তলস্তয়ের জীবনে নেমে এল বিরাট এক আঘাত । তাঁর প্রিয় পুত্রের মৃত্য হল । এই মৃত্যুতে সাময়িকভাবে ভেঙে পড়লেন তলস্তয় ।
ইতিমধ্যে তাঁর আরো কিছু রচনা প্রকাশিত হল । জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও তাঁর সৃজনশক্তি এতটুকুও হ্রাস পায়নি । এই সময়ে তিনি লিখতে আরম্ভ করলেন তাঁর একটি বড় গল্প “হাজী মুরাদ” । এই গল্পটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যর পর । এটি তাঁর একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ  রচনা । হাজি মুরাদ রচনার সাথে সাথে তিনি তাঁর আর একটি বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস! “নবজন্ম” । রাশিয়ায় জার তৃতীয় আলেকজান্ডার মারা গেলেন । নতুন জার হলেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় নিকোলাস। তৃতীয় আলেকজান্ডার ছিলেন অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী । কিন্তু তাঁর পুত্র ছিলেন যেমন অত্যাচারী তেমনি নিষ্ঠুর । সমস্ত দেশ জুড়ে শুরু হল ধরপাকড় আর নির্যাতন। তলস্তয়ের বিরুদ্ধে কোন কিছু না করলেও তাঁর অনুগামীদের কারাগারে পাঠানো হল । শুরু হল তাঁদের উপর নির্যাতন । সরকারের অনুগত ধর্মপ্রতিষ্ঠানের তরফে বলা হল কোন যাজক তাঁর সৎকারে যেন অংশ না নেয় ।

এদিকে দেশ জুড়ে লেলিনের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল বিপ্লবী আন্দোলন । ১৯০৮ সালে প্রকাশিত হল তাঁর আবেগময় প্রবন্ধ, “আমি নীরব থাকতে পারি না” এতে তিনি বিপ্লবীদের উপর অত্যাচারের তীব্র ভাষায় নিন্দা করলেন সাথে সাথে এই রচনা নিষিদ্ধ করা হল ।
আশি বছরে পা দিলেন তলস্তয় । সমস্ত দেশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবতা আর রুশ সংসস্কৃতির মূর্ত প্রতীক ।
সমস্ত পৃথিবী তাঁকে সম্মান জানালেও সংসারে চরম অশান্তি । তলস্তয় তাঁর সমস্ত রচনায় গ্রন্থস্বত্ব সমগ্র মানবজাতিকে দান করেছিলেন । তার স্ত্রী সোফিয়া এটি মেনে নিতে পারছিলেন না । তাঁর অর্থের প্রতি লোভ ক্রমশই বেড়ে চলছিল । এক এক সময় বিবাদ তীব্র আকার ধারণ করত । ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়লেন তলস্তয় । এই সময় তাঁকে সেবা-শুশ্রুষা করতেন তাঁর ছোট মেয়ে আলেকজান্ডার । কিন্তু স্ত্রী নির্যাতন এমন অবস্থায় পৌঁছাল তিনি আর ঘরে থাকতে পারলেন না । বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে ।

পথে আস্তাপগে নামে এক স্টেশনে এসে নেমে পড়লেন । তখন তাঁর প্রচন্ড জ্বর সেই সাথে কাশির সঙ্গে রক্ত উঠছে । স্টেশন সংলগ্ন একটি বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ১৯১০ এর ৭ ই নভেম্বর

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + six =