নীড় / মনীষীর জীবনী / ৩৭. লেনিন
Lenin

৩৭. লেনিন

৩৭. লেনিন
[১৮৭০-১৯২৪]

পুরো নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানফ । যদিও তিনি বিশ্বের সমস্ত মানুষের কাছে পরিচিত ভিন্ন নামে । রুশ বিপ্লবের প্রাণ পুরুষ ভি, আই লেনিন । জারের পুলিশকে ফাঁকি দেবার জন্য তিনি ছদ্মনাম নেন লেনিন । লেনিনের জন্ম রাশিয়ার এক শিক্ষিত পরিবারে ১৮৭০ সালের ২২ শে এপ্রিল (রাশিয়ার পুরনো ক্যালেন্ডার অনুসারে  ১০ ই এপ্রিল) । লেনিনের পিতা-মাতা থাকতেন ভল্গা নদীর তীরে সিমবিস্ক শহরে । ছয় ভাইবোনের মধ্যে লেনিন ছিলেন তৃতীয় । লেনিনের বাবা ইলিয়া অস্ত্রাকান ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ।

ছটি সন্তানের উপরেই ছিল বাবা-মায়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব । তবে লেনিনের জীবনে যার প্রভাব পড়েছিল বাবা-মায়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব । তবে লেনিনের জীবনে যার প্রভাব পড়েছিল সবচেয়ে বেশি তিনি লেনিনের বড় ভাই আলেকজান্ডার । আলেকজান্ডার ছিলেন সেন্ট পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র । তিনি “নারোদনায়া ভোলিয়ার” নামে এক বিপ্লবী সংগঠনের সভ্য হিসাবে গোপনে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন  ।

“নারোদনায়া ভোলিয়ার” বিপ্লবী দলের সদস্যরা স্থির করলেন যার তৃতীয় আলেকজান্ডারকেও হত্যা করা হবে । লেনিনের ভাই আলেকজান্ডারও এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হলেন । এই সময় (১৮৮৬ সাল) লেনিনের বাবা হঠাৎ মারা গেলেন । যখন পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন জারের গুপ্তচর বিভাগের লোকজন সব কিছু জানতে পেরে গেল ।অন্য সকলের সাথে আলেকজান্ডার ও ধরা পড়লেন । বিচারের অন্য চারজনের সাথে তার ফাঁসি হল ।

বড় ভাইয়ের মৃত্যু লেনিনের জীবনে একটি বড় আঘাত হয়ে এসেছিল । এই সময়ে লেনিনের বয়স মাত্র সতেরো । তিনি স্থির করলেন  তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হবেন ।

ছেলেবেলা থেকেই পড়াশুনায় ছিল তার গভীর আগ্রহ আর মেধা । প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল ফল করে ভর্তি হলেন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে । সেই সময় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটি বিপ্লবী কেন্দ্র ।

১৮৮৭ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছাত্রদের এক বিরাট সভা হল । সেই সভার নেতৃত্বের ভার ছিল লেনিনের উপর । এই কাজের জন্য তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হল । শুধু তাই নয়, পাছে তিনি নতুন কোন আন্দোলন শুরু করেন সেই জন্য ৭ই ডিসেম্বর তাকে কাজানের গভর্নরের নির্দেশে কোফুশনিকো নামে এক গ্রামে নির্বাসন দেওয়া হল ।
এক বছরের নির্বাসন শেষ হল । লেনিন ফিরে এলেন কাজান শহরে । তার ইচ্ছা ছিল আবার পড়াশুনা শুরু করবেন । কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির অনুমতি দেওয়া হল না ।

কাজানে ছিল একটি বিপ্লবী পাঠক্রম । তার সকল সদস্যরাই মার্কসবাদের চর্চা করত, পড়াশুনা করত, লেনিন এই পাঠচক্রের সদস্য হলেন । এখানেই তিনি প্রথম মার্কসীয় দর্শনের সাথে গভীরভাবে পরিচিত হলেন ।

এদিকে তার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশই খারাপ হয়ে আসছিল । বাধ্য হয়ে উলিয়ানফ পরিবারের সদস্যরা এলেন সামারার মফঃস্বল অঞ্চলে । সামারায় এসে লেনিন স্থির করলেন তিনি আইনের পরীক্ষা দেবেন । পড়াশুনা বছরের পাঠক্রম মাত্র দেড় বছরে শেষ করে তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গে পরীক্ষা দিতে গেলেন । এ পরীক্ষার ফল বার হওয়ার পর দেখা গেল লেনিন প্রথম স্থান অধিকার করেছেন ।

১৮৯২ সাল নাগাদ তিনি সামারা কোর্টে আইনজীবী হিসাবে যোগ দিলেন ।

কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন সামারা বা কাজান তার কাজের উপযুক্ত জায়গা নয় । আইনের ব্যবসাতেও মনোযোগী হতে পারছিলেন না । সামারা ছেড়ে এলেন সেন্ট পিটার্সবুর্গে ।

লেনিন লিখলেন তার প্রথম প্রবন্ধ “ জনসাধারণের বন্ধুরা কিরকম এবং কিভাবে তারা সোসাল ডেমক্রেটদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।” এই প্রবন্ধ তিনি প্রথম বললেন, কৃষক শ্রমিক মৈত্রীর কথা। একমাত্র এই মৈত্রী পারে স্বৈরতন্ত্র, জমিদার ও বুর্জোয়াদের ক্ষমতার উচ্ছেদ, শ্রমিকদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং নতুন কমিউনিস্ট সমাজ গঠন করতে ।

এই সব লেখালেখি প্রচারের সাথে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন । ১৮৯৬ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবুর্গের মার্কসবাদী চক্রগুলিকে নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির জন্য “সংগ্রামের সঙ্ঘ” নামে একটিমাত্র রাজনৈতিক সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ করেন । পরবর্তীকালে যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল, এই সঙ্ঘ তারই ভ্রুণাবস্থায় ।

এই কাজের মধ্যেই লেনিনের সাথে পরিচয় হল নাদেজুদা ক্রপস্কাইয়ার সাথে । নাদেজুদা ছিলেন একটি নৈশ বিদ্যালয় শিক্ষিকা । এখানে প্রচার করতে আসতেন লেনিন । সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে আলাপ হল । দুজনে দুজনের মতাদর্শ, আদর্শের সাথে পরিচিত হলেন । অল্পদিনের মধ্যেই দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল মধুর সম্পর্ক । নাদেজুদাও লেনিনের সাথে সংঘ পরিচালনার কাজে যুক্ত হলেন । তার কাজকর্ম ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল । এই সময় থোর্নটোন কারখানায় শ্রমিকরা ধর্মঘট করল । এই ধর্মঘটের নেতৃত্বের ভার ছিল “সংগ্রাম সঙ্ঘের” উপর । এই ধর্মঘটের সাফল্যের প্রতিক্রিয়া অন্য অঞ্চলের শ্রমিকদের উপর গিয়ে পড়ল ।

জারের পুলিশবাহিনী তৎপর হয়ে উঠল । লেনিনের সাথে সংগঠনের প্রায় সমস্ত নেতাকে গ্রেফতার করা হল । নিষিদ্ধ করা হল শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্ঘ ।

লেনিনকে সেন্ট পিটার্সবুর্গের জেলখানার এক নির্জন কক্ষে বন্দী করে রেখে দেওয়া হল । জেলে বসে তিনি অনেকগুলি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন ।

চোদ্দ মাস বন্দী থাকবার পর তিন বছরের জন্য লেনিনকে নির্বাসন দেওয়া হল সাইবেরিয়ায় । এক বছর পর নির্বাসিত হয়ে এলেন লেনিনের প্রিয়তমা ক্রপস্কাইয়া । প্রথমে তাকে অন্য জায়গায় নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল কিন্তু লেনিনের বাগদত্তা বলে তাকে শুশেনস্কায়েতে থাকবার অনুমতি দেওয়া হল । দুমাস পর তাদের বিয়ে হল । ১১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন তার প্রকৃত বন্ধু, সঙ্গী এবং বিশস্ত সহকারী ।

আন্তরিক প্রচেষ্টায় বেশ কিছু বই আনিয়ে নিলেন লেনিন । তার মধ্যে ছিল মার্কস- এঙ্গেলসের রচনাবলী । এখানেই তিনি তাদের রচনা জার্মান থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ শুরু করলেন । এছাড়া একের পর এক গ্রন্থ রচনা করতে আরম্ভ করলেন । এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল “রাশিয়ায় সোসাল ডেমোক্রোটদের কর্তব্য” । এছাড়া “রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ” – এই দুটি বইয়ের মধ্যে লেনিনের চিন্তা-মনীষা, ভবিষৎ জীবনের পরিকল্পনার স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে । দ্বিতীয় বইটি রচনার সময় তিনি প্রথম ছদ্মনাম ব্যবহার করলেন লেনিন ।

চিন্তা-ভাবনা পরিশ্রমের ফলে নির্বাসন শেষ হওয়ার কয়েকমাস আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন । কিন্তু ক্রুপস্কাইয়ার সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে উঠলেন । অবশেষে নির্বাসন দন্ডের মেয়াদ শেষ হলে ১৯০০ সালের ২৯ জানুয়ারি রওনা হলেন ।

লেনিন ফিরে এলেন । তাকে সেন্ট পিটার্সবুর্গে থাকবার অনুমতি দেওয়া হল না । এমনকি কোন শিল্পনগরীতে বসবাস নিষিদ্ধ করা হল । বাধ্য হয়ে সেন্ট পিটার্সবুর্গের কাছেই পসকফ বলে এক শহরে বাসা করলেন । এতে রাজধানীর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে ।

ঘুরে ঘুরে অল্পদিনের মধ্যেই নিজের কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করে ফেললেন । তার এই গোপন কাজকর্মের কথা জারের পুলিশবাহিনী কাছে গোপন ছিল না । একটি রিপোর্ট তার বিরুদ্ধে লেখা হল, “বিপ্লবীদের দলে উলিয়ানফের উপরে কেউ নেই । মহামান্য জারকে রক্ষা করতে গেলে তাকে সরিয়ে ফেলতে হবে ।” লেনিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হল ।

সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে কখনো পায়ে হেটে কখনো ঘোড়ার গাড়িতে চেপে সীমান্ত পার হয়ে এলেন জার্মানি ।

জার্মানিতে এসে প্রথমেই স্থির করলেন একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন । ১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাসে জার্মানির লিপজিগ শহর থেকে প্রকাশিত হল নতুন পত্রিকা ইসক্রা । যার অর্থ স্ফুলিঙ্গ । সেইদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এই স্ফুলিঙ্গই একদিন দাবানলে মতে জ্বলে উঠবে ।

সম্পূর্ণ গোপনে এই পত্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হল রাশিয়ায় । সেখান থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হল দিকে দিকে । অল্পদিনের মধ্যেই ইসক্রা হয়ে উঠল বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান মুখপত্র । আর জার্মানিতে থাকা সম্ভব হল না । গোয়েন্দা পুলিশের লোকজন এই সব বিপ্লবী কাজকর্ম বন্ধ করবার জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠল । বিপদ আসন্ন বুঝতে পেরে লেনিন ও তার সঙ্গীরা জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে এলেন ইংল্যান্ডে ।

কিছুদিন পর সংবাদ পেলেন তার মা আর বোন ফ্রান্সের একটি ছোট শহরে এসে রয়েছেন । মায়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য প্যারিসে গেলেন ।

প্যারিস ত্যাগ করে আবার লন্ডনে ফিরে এলেন । কিন্তু এখান থেকে পত্রিকা প্রকাশ করার কাজ অসুবিধাজনক বিবেচনা করেই সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় চলে এলেন । তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্রুপস্কাইয়া ।  একটি ছোট বাড়ি ভাড়া করলেন দুজনে । অল্পদিনের মধ্যে এই বাড়িটি হয়ে উঠল বিপ্লবীদের প্রধাণ কর্মক্ষেত্র । ১৯০৩ সালে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস শহরে পার্টির অধিবেশন বসল । পুলিশের ভয়ে একটি ময়দান গুদামে সকলে জমায়েত হল । এখানেই জন্ম নিল বলশেভিক পার্টি । পার্টি কংগ্রেসগুলির প্রস্তুতি ও অধিবেশনে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছেন । ১৯০৫ সালের তৃতীয়, ১৯০৬ সালের চতুর্থ, ১৯০৭ সালের পঞ্চম কংগ্রেসে তিনিই প্রধাণ রিপোর্টগুলি পেশ করেন । কংগ্রেসে বলশেভিক ( সংখ্যাগরিষ্ঠ) আর মেনশেভিকদের মধ্যে যে লড়াই চলে তার কথা তিনি শ্রমিক সাধারণের সামনে তুলে ধরেন ।
একটু একটু করে যখন গড়ে উঠছে শ্রমিক শেণীর বিপ্লবী দল, ঠিক সময় ১৯০৫ সালে রাশিয়ার বুকে ঘটল এক রক্তাক্ত অধ্যায় । সেন্ট পিটার্সবুর্গে ছিল জারের শীতের প্রাসাদ । বন্ধ কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক তাদের ছেলে মেয়ে বৌ নিয়ে সেখান এসে ধর্না দিল । জারের প্রহরীরা নির্মমভাবে তাদের উপর গুলি চালাল । দিনটা ছিল ১৯০৫ সালের ৯ই জানুয়ারি । এক হাজারেরও বেশি মানুষ মারা পড়ল । রক্তের নদী বয়ে গেল সমস্ত প্রান্তর জুড়ে । এই পৈশাচিক ঘটনায় বিক্ষোভ আর ক্রোধে ফেটে পড়ল সমস্ত দেশ । গণ আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রান্তে প্রান্তে ।
বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সরাসরি পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে । দেশ জুড়ে ধর্মঘট শুরু হয় । এই পরিস্থিতিতে আর দেশের বাইরে থাকা সম্ভব নয়, বিবেচনা করেই দীর্ঘ দিন পর রাশিয়ায় ফিরে এলেন লেনিন ।

৫ই ডিসেম্বর মস্কো শহরে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হল । দুদিন পর এই ধর্মঘট প্রত্যক্ষ বিদ্রোহের রূপ নিল ।  রাস্তায় রাস্তায় গড়ে উঠল ব্যারিকেড । রেললাইন তুলে ফেলা হল । শ্রমিকরা যে যা অস্ত্র পেল তাই নিয়ে লড়াই শুরু করল । কিন্তু শেষ রক্ষা হল না, জারের সৈনিকরা নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করল । শত শত মানুষকে হত্যা করা হল । হাজার হাজার মানুষকে বন্দী করে নির্বাসন দেওয়া হল । চরম অত্যাচারের মধ্যে জার চাইলেন বিপ্লবের মেরুদন্ড ভেঙে দিতে । কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে জ্বলে ওঠা আগুনকে কি নেবানো যায় ।
১৯০৭ সাল নাগাদ ফিনল্যান্ডের এক গ্রামের গিয়ে আশ্রয় নিলেন লেনিন । এখানে থাকতেন চাষীর ছদ্মবেশে । নেতারা নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ করতেন । এই সংবাদ জারের গুপ্তচরদের কানে গিয়ে পৌঁছাল, জারের তরফ থেকে ফিনল্যান্ডের সরকারের কাছে অনুরোধ করা হল লেনিনকে বন্দী করে তাদের হাতে তুলে দেবার জন্য । গোপনে এই সংবাদ পেয়ে দেশ ছাড়লেন লেনিন ।

ফিনল্যান্ড পার হয়ে এলেন স্টকহোমে । সেখানে তারই প্রতীক্ষায় ছিলেন ক্রুপস্কাইয়া । দুজনে এলেন জেনিভায় । দেশের বাইরে গেলেও দেশের সঙ্গে যোগাযোগ এক মুহূর্তের জন্য বিচ্ছিন্ন হল না ।

একদিকে যেমন দেশের সমস্ত সংবাদ তিনি সংগ্রহ করতেন, অন্যদিকে তার বিশ্বাসী অনুগামীদের মাধ্যমে বলশেভিক পার্টিকর্মীদের কাছে নির্দেশ উপদেশ দিতেন ।

বলশেভিক পার্টির মুখপাত্র প্রলেতারি পত্রিকা হত জেনিভা থেকে । কিন্তু রাজনৈতিক কারণে এই পত্রিকার অফিস সরিয়ে নিয়ে আসা হল প্যারিসে । এখানে আরো অনেক পলাতক রুশ বিপ্লবী আশ্রয় নিয়েছিল । সেই সময় প্যারিস ছিল বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল । রাশিয়া থেকে বিপ্লবী সংগঠনের নেতারা এসে তার সাথে দেখা করত ।

এদিকে রাশিয়ায় আন্দোলন ক্রমশই জোরদার হয়ে উঠতে থাকে । বলশেভিক পার্টির তরফে যে সমস্ত পত্রিকা বার হত তার চাহিদা ক্রমশই বেড়ে চলছিল । পার্টির সদস্যদের কাছ থেকে আবেদন আসতে থাকে, সাপ্তাহিক পত্রিকা নয়, চাই দৈনিক পত্রিকা ।

লেনিন নিজেও একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করবার কথা ভাবছিলেন । ১৯১২ সালে প্রকাশিত হল শ্রমিক শেণীর দৈনিক পত্রিকা প্রাভদা । এর অর্থ সত্য । লেনিন ও স্তালিন যুগ্মভাবে এর সম্পাদক হলেন । এই পত্রিকা রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে । এই পত্রিকায় লেনিন অসংখ্য রচনা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ছদ্মনামে ।

এরই মধ্যে দেখা দিল বিশ্বযুদ্ধ । হিংস্র উন্মাদনায় মেতে উঠল বিভিন্ন দেশ । লেনিন উপলব্ধি করেছিলেন এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফলাফল । জারের লোহার শেকল আলগা হতে আরম্ভ করেছে । এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে ।

১৯১৭ সালের ১৬ ই এপ্রিল দীর্ঘ দশ বছর পর দেশে ফিরলেন । তিনি এসে উঠলেন তার বোন আনার বাড়িতে ।

অতিরিক্ত পরিশ্রমে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে লেনিনের ডান হাত-পা অসাড় হয়ে আসে । চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হতেই আবার কাজ শুরু করলেন । কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন । অবশেষে ২১ শে জানুয়ারি ১৯২৪ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন সর্বহারা নেতা লেনিন ।

তাই পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে যেখানেই শোষিত বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম, সেখানেই উচ্চারিত হয় একটি নাম মহামতি লেনিন ।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =