নীড় / মনীষীর জীবনী / ৪২. হেলেন কেলার
Helen-Keller

৪২. হেলেন কেলার

৪২. হেলেন কেলার
[১৮৮০-১৯৬৮]

হেলেনের জন্ম ১৮৮০ সালের ২৭শে জুন উত্তর আমেরিকার টুসকুমবিয়া নামে এক ছোট শহরে।বাবার নাম আর্থার কেলার, মায়ের নাম ক্যাথরিন।আর্থার ছিলেন সামরকি বিভাগের একজন অফিসার।জন্ম সূত্রে সুইডিশ।তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকায় এসেছিল। জন্মের সময় হেলেন ছিলেন সুস্থ সবল স্বাভাবিক আর দশটি শিশুর মত। এক বছর বয়সে তার কলকাকলি আর চঞ্চল পদশব্দে সমস্ত ঘর ভরে উঠত।দেখতে দেখতে এক বছর সাত মাসে পা দিলেন হেলেন। একদিন মা তাকে গোসল করিয়ে ঘর থেকে বার হচ্ছিলেন। মায়ের কোল থেকে মাটিতে থেকে মাটিতে পরে গেলেন হেলেন। সাথে সাথে জ্ঞান হারালেন হেলেন।যখন জ্ঞান ফিরল তখন প্রবল জ্বর। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখলেন আর জ্বর নেই হেলেনের। হঠাৎ যেমন জ্বর এসেছিল তেমনিভাবেই জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। আনন্দে উল্লাসিত হয়ে উঠলেন মা-বাবা। তখন তারা কল্পনাও করতে পারেননি ভয়স্কর এক দুর্যোগ নেমে এসেছে তাদের একমাত্র সন্তানের জীবনে।

অল্প কিছুদিন যেতেই অনুভব করলেন,আসস্মিক আসা সেই জ্বর কেড়ে নিয়েছে হেলেনের দৃষ্টিশক্তি আর শ্রবণশক্তি।ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বললেন,পাকস্থলী আর মস্তিকে আঘাত পাওয়ার জন্যেই হেলেনের জীবনে এই বিপর্যয়। মেয়ের এই অসহায়তা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন কেলার দম্পতি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন এই মেয়ের জীবনে আর  কোন আশা নেই, আলো নেই। একমাত্র যদি কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটে।

হেলেন তখন পাঁচ বছর বয়স। চিকিৎসকদের উপর সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন আর্থার। এমন সময় সংবাদ পেলেন গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী একব্যক্তি নাকি দূরারোগ্য যে কোন ব্যাধি সারাতে পারেন। হেলেনকে তার কাছে নিয়ে গেলেন আর্থার। গুপ্তবিদ্যার প্রভাব হেলেনের জীবনে কোন পরিবর্তন হল না , কিন্তু সেই ভদ্রলোক হেলেনকে লেখাপড়া শেখাবার পরামর্শ দিলেন। তাহলে হয়ত হেলেনের জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে।

আর্থার ভেবে পেলেন না তার এই বোবা ,অন্ধ মেয়েকে কিভাবে লেখাপড়া শেখাবেন।

ভাগ্যক্রমে সেই সময় ওয়াশিংটনের বিখ্যাত ডাক্তার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে পরিচয় হল।ডাক্তার বেল তাকে পরামর্শ দিলেন বোস্টনের পার্কিনস ইনন্টিটিউশনের সাথে যোগাযোগ করতে। এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন ডাক্তার হো। এখানে অন্ধদের কিভাবে শিক্ষা দেওয়া হত। ডাক্তার হো হেলেনের মত একটি অন্ধ বোবা মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।স্বামীর সাথে ক্যাথরিনও এই প্রতিষ্ঠানটির সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

সেই সময় হো মারা গিয়েছিলেন।পার্কিনস ইনস্টিটিউশনের নতুন ডিরেক্টর হয়ে এসেছিলেন মাইকেল এ্যাগানোস।তিনি কেলার দম্পতির মুখে হেলেনের সমস্ত কথা শুনে একজন শিক্ষয়িত্রীর উপর তার শিক্ষার ভার দেবার পরামর্শ দিলেন।

একদিন সকালে আলবামা শহরে পরিবারের বাড়িতে এসে হাজির হলেন একুশ বছরের এক তরুণী মিস অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড।হেলেন কেলারের অন্ধকার জীবনে তিনি নিয়ে এলেন প্রথম আলো। অ্যানির ছেলেবেলা থেকেই দৃষ্টিশক্তি কম ছিল, তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল ম্যাসচুসেট প্রতিবন্ধী আশ্রমে। এই সময় অ্যানি পার্কিনস ইনস্টিটিউটের কথা শুনতে পান।

পার্কিনস ইনস্টিটিউটে ছয় বছর ছিলেন অ্যানি। কয়েকজন বিখ্যাত ডাক্তার এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন।তাদের চিকিৎসায় এবং দুবার অপারেশনের পর চোখের স্বাভাবিক ‍দৃষ্টি ফিরে পেলেন অ্যানি। অন্ধত্বের নিদারুন যন্ত্রণার কথা ভেবে অ্যানি স্থির করলেন তিনি অন্ধদের শিক্ষা দেওয়ার কাজেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন।সেদিন ছিল ৩রা মার্চ ১৮৮৭।

প্রতিটি বস্তুর সাথে প্রথমে পরিচয় করাতেন অ্যানি। হেলেন তার স্পর্শ অনুভূতি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতেন তার উপর লিখতেন সেই বস্তুর নাম। কখনো আবার হেলেনকে দিয়ে বার বার লেখাতেন সেই নাম।

অল্পদিনেই প্রকাশ পেল হেলেনের অসামান্য প্রতিভা। অ্যানি যা কিছু শেখাতেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তা লিখে নিতেন হেলেন। লুই ব্রেলা আবিষ্কৃত ব্রেল পদ্ধতিতে(এই পদ্ধতিতে অন্ধরা পড়াশুনা করে) হেলেন কয়েক বছরের মধ্যে শিখলেন ইংরেজি,লাটিন,গ্রীক,ফরাসি এবং জার্মান ভাষা। আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে তিনি খুব সহজেই নিজের মনোভাব প্রকাশ পারতেন।

হেলেনের একজন অনুরাগী ছিলেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোকাল ফিজিওলজির অধ্যাপক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল(ডাক্তার বেলই প্রথম হেলেনের বাবাকে পার্কিনস ইনস্টিটিউটের সন্ধান দেন)। ডাক্তার বেলই টেলিফোনের আবিষ্কারক। হেলেনকে নিজের কন্যার মত স্নেহ করতেন,তাকে নানাভাবে সাহায্য করতেন।

ডাক্তার বেলের নেশা ছিল দেশভ্রমণের।হেলেন এবং অ্যানিকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লেন ইউরোপে। দেশ ভ্রমনের সমাজ কল্যাণের কাজের মধ্যেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন।তার লেখা কয়েকখানি উল্লেখযোগ্য বই,আমার জীবন কাহিনী,১৯০৩(The story of my life), আমার জগৎ ,১৯০৮ (The world I live in),বিশ্বাস রাখ,১৯০৪(Let us have faith) শিক্ষিকা মিস অ্যানি স্যুলিভান,১৯৫৫(Teacher Annie Sulivan), খোলা দরজা,১৯৫৭(The open door)।

১৯৫০ সালে সতের বছর বয়সে পা ছিলেন হেলেন কেলার। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন।প্যারিসে সেই উপলক্ষে এক বিরাট সস্বর্ধনার আয়োজন করা হল। দেশ-বিদেশ থেকে সাংবাদিকের দল এসে ভিড় করল প্যারিসে সকলেই ভেবেছিল তিনি বোধ এই কর্মময় ঝবিন থেকে ছুটি নেবেন।কিন্তু কেলার ছিলেন এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ।সেবা আর কর্মের মাঝেই একাত্ম হয়েছিল তার জীবন। তাই ১লা জুলাই ১৯৬৮ সালে যখন তিনি মারা গেলেন তখনও তিনি ছিলেন কর্মরত।

পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও হেলেন কেলার আজও পৃথিবীর সমস্ত অন্ধ বিকলাঙ্গ পঙ্গু প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এক প্রেরণা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন জীবনের দৃষ্টান্ত প্রকৃতই বিরল।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =