নীড় / মনীষীর জীবনী / ২৮. হ্যানিম্যান
হ্যানিমান

২৮. হ্যানিম্যান

            ২৮. হ্যানিম্যান
           (১৭৫৫১৮৪৩)

১৭৫৫ সালের ১০ এপ্রিল (কারো কারো মতে ১১ এপ্রিল) মধ্যরাতে জার্মান দেশের অর্ন্তগত মারগ্রেওয়েট প্রদেশের অর্ন্তগত মিসেন শহরে এক দরিদ্র চিত্রকরের গৃহে জন্ম হল এক শিশুর।দরিদ্র পিতামাতার মনে হয়েছিল আর দশটি পরিবারে যেমন সন্তান আসে,তাদের পরিবারেও তেমনি সন্তান এসেছে। তাকে নিয়ে বড় কিছু ভাববার মানসিকতা  ছিল না তাদের।তাই অবহেলা আর দারিদ্রের মধ্যেই বড় হয়ে ঊঠল সেই শিশু।

তখনো কেঊ কল্পনা করতে পারেনি এই শিশুই একদিন হয়ে  উঠবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন ধারার জন্মদাতা, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা  ব্যবস্থার জনক ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিমান।

হ্যানিমানের বাবা গগফ্রিড মিসেন শহরের একটা চীনামাটির কারখানায় বাসনের উপর নানান নক্স্রা করতেন, ছবি আকঁতেন ।এ কাজে যা পেতেন তাতে অতি কষ্টে সংসার চলত। হ্যানিমানের ছিলেন চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। পিতামাতার প্রথম পুত্র সন্তান। গডফ্রিডের আশা ছিল হ্যানিম্যান বড় হয়ে উঠলে তারই সাথে ছবি আকাঁর কাজ করবে, তাতে হয়তো সংসারে আর্থিক সমস্যা কিছুটা দূর হবে।

কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হ্যানিম্যানের ছিল শিক্ষার প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ। বাড়িতেই বাবামায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হল ।বারো বছর  বয়েসে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন স্থানীয় টাউন স্কুলে। অল্পদিনের মধ্যে তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন তাঁর শিক্ষকরা।

বিশেষত গ্রীক ভাষায় তিনি এতখানি দক্ষতা  অর্জন  করেছিলেন, শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তিনিই প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের গ্রীক ভাষা পড়াতেন।

টাঊন স্কুলে শিক্ষা শেষ করে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন প্রিন্সেস স্কুলে। এদিকে সংসারে ক্রমশই অভাব আর দারিদ্র্য প্রকট হয়ে উঠছিল। গডফ্রিডের পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। নিরুপায় হ্যানিম্যানকে স্কুলে থেকে ছাড়িয়ে লিপজিক শহরে এক মুদির দোকানে মাল কেনাবেচার কাজে লাগিয়ে দিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এ কথা জানতে পেরে হ্যানিম্যানের স্কুলের মাইনে ও অন্যসব খরচ ও মকূব করে দিল যাতে আবার হ্যানিম্যান পড়াশুনা আরম্ভ করতে পারেন। যথাসময়ে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় অসাধারণ কৃর্তিত্বের সাথে ঊর্ত্তীণ হলেন হ্যানিম্যান। তিনি একাধিক ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

ক্রমশই তাঁর মধ্যে  উচ্চশিক্ষার  আকাস্খা তীব্র হয়ে উঠেছিল। পিতার অমতেই লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি  হবার জন্যে বেরিয়ে পড়লেন। হাতে সম্বল মাত্র ২০ খেরল (আমাদের দেশের ১৪ টাকার মত)। তিনি  ভর্তি হলেন লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।নিজের খরচ মেটাবার জন্য এক ধনী গ্রীক যুবককে জার্মান এবং ফরাসি ভাষা  শেখাতেন।এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশের তরফে অনুবাদের কাজ করতেন।

হ্যানিম্যানের  ইচ্ছা ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। তখন কোন ডাক্তারের অধীনে থেকে কাজ শিখতে হত। লিপজিক কোন ভাল কোয়ারিনের কাছে কাজ করার সুযোগ পেলেন।তখন তাঁর বয়স বাইশ বছর । ইত্যিমধ্যেই তিনি গ্রীক,লাটিন, ইংরেজি ,ইতালিয়ান,হিব্রু, আরবি,স্শ্যানিশ এবং জার্মান ভাষায় যথেষ্ঠ পান্ডিত্য অর্জন করেছেন। এবার ভাষায়তত্ত্ব ছেড়ে শুরু হল চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন।

দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময় তাঁর সামান্য গচ্ছিত অর্থ একদিন চুরি হয়ে গেল। নিদারুণ অর্থ সংকটে পড়লেন হ্যানিম্যান। এই বিপদের দিনে তাঁকে সাহায্য করলেন স্থানীয় গভর্নর। তাঁর লাইব্রেরী দেখাশোনার ভার দিলেন হ্যানিম্যানকে। এই সুযোগটিকে পুরোপুরি সদব্যবহার করেছিলেন তিনি। এক বছর নয় মাসে লাইব্রেরীর প্রায় সমস্ত বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন।

হাতে কিছু অর্থ  সঞ্চয় হতেই  তিনি ভর্তি  হলেন আরল্যানজেন বিশ্ববিদ্যালয় । এখন থেকেই তিনি চব্বিশ বছর বয়েসে”ডক্টর অব মেডিসিন” উপাধি পেলেন।

ডাক্তারি পাস করে এক বছর তিনি প্র্যাকটিস করার পর জার্মানির এক হাসপাতালে চাকরি পেলেন।

এই সময় চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধীয় প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। এই প্রবন্ধে নতুন কিছু বক্তব্য না থাকলেও রচনার মৌলিকত্ব অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

অন্য সব বিষয়ের মধ্যে রসায়নের প্রতি হ্যানিম্যানের ছিল সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। সেই সূত্রেই হেসলার নামে এক ঔষধের কারবারি সাথে পরিচয় হল। নিয়মিত তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করতে হত। হেসলারের সাথে থাকতেন তাঁর পালিত কন্যা হেনরিয়েটা। হেনরিয়েটা ছিলেন সুন্দরী বুদ্ধিমতী। অল্পদিনেই দুই তরুন-তরুনী পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেন।১৭৮২ সালের ১৭ নভেম্বরে দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। হ্যানিম্যানের বয়স তথন ২৭ এবং হেনরিয়েটার ১৮। বিয়ের পরের বছরেই তাঁদের প্রথম সন্তান জন্ম নিল।

এই সময় হ্যানিম্যান রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন রচনা প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন।তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ,”কিভাবে ক্ষত এবং ঘা সারানো যায় সে নির্দেশনামা”

এই বই পড়লেই বোঝা তরুণ চিকিৎসক হ্যানিম্যান নিজের অধিগত বিষয়ে কতখানি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এই সময় থেকেই  আরো গভীরভাবে পড়াশুনা  এবং বিভেন্ন প্রবন্ধ রচনা ও অনুবাদের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

সে যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা অন্য বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না। কিন্তু হ্যানিম্যানের আগ্রহ ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। বিশেষভাবে তিনি রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ফরাসি ভাষা থেকে জার্মান ভাষায় একাধিক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই খন্ডে Art of manufacturing chemical products. এছাড়া দুই খন্ডে Art of distilling liquors.রসায়নের ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা সেই যুগে যথেষ্ঠ সাড়া জাগিয়েছিল।

তাঁর লেখা on arsenic poisoning ফরেনসিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

এই সময় তিনি ডাক্তার ওয়াগলার এর সাথে টাউন হাসপাতালে ডাক্তারি করতেন।হঠাৎ ডাক্তার ওয়াগলার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সমস্ত হাসপাতালের দায়িত্ব এসে পড়ল হ্যানিম্যানের উপর।পরের কয়েক বছর তিনি অজস্র বই অনুবাদ করেন এবং Mercurius solubillis আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত হয়ে গেলেন। চিকিৎসক হিসাবে তখন তাঁর নাম যশ চারদিকে এতখানি ছড়িয়ে পড়েছিল যে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারতেন ।মনের মধ্যে তখন নতুন কিছু উদ্ভাবনের স্বপ্ন ধীরে ধীরে জেগে উঠেছিল।তিনি অনুভব করতে পারছিলেন সমস্ত দিন হাসপাতালে কাটিয়ে মনের ইচ্ছা পূর্ণ করা সম্ভব হবে না। তাই হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য পুরোপুরি অনুবাদের কাজে হাত দিলেন।

১৭৯১ সালে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাক্তার কালেনের একটি বই এ্যালোপ্যাখিক মেটিরিয়া মেডিকার ইংরেজ থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদের কাজ হাতে দেন। এই বইয়ের একটি অধ্যায়ের cinchona bark পাদটীকায় লেখা ছিল ম্যালেরিয়া জ্বরের ঔষধ কুইনাইন যদি কোন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা যায় তবে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর শরীরে ম্যালেরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাবে।

ক্যালেনের এই অভিমত হ্যানিম্যানের চিন্তা জগতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করল। তিনি এর সত্যাসত্য পরীক্ষার জন্য নিজেই প্রতিদিন ৪ ড্রাম করে দুবার সিস্কোনার রস খেতে আরম্ভ করলেন। এর তিন-চারদিন পর সত্যি সত্যিই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলেন।এরপর পরিবারের প্রত্যেকের উপর এই পরীক্ষা করলেন এবং প্রতিবারই একই ফলাফল পেলেন। এর থেকে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগে উঠল, কুইনাইনের মধ্যে কি রোগের লক্ষণ এবং ঔষধের লক্ষণের সাদৃশ্য সৃষ্টিকারী কোন ক্ষমতা আছে? অথবা অন্য সমস্ত ঔষধের মধ্যেই কি এই ক্ষমতা আছে? অর্থাৎ মানুষের দেহে অসুস্থ অবস্থায় যে সব লক্ষণ প্রকাশ পায় তাঁর বিপরীত ক্রিয়াশক্তি সম্পন্ন ঔষধেই রোগ আরোগ্য হয়। এই প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে শুরু হল তাঁর গবেষণা।

এই সময় তিনি যাযাবরের মত এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন।স্থায়ী  কোন আস্তানা গড়ে তুলতে পারেননি।গোথার ডিউক মানসিক রোগের চিকিৎসালয় খোলার জন্য তাঁর বাগান বাড়িটি হ্যানিম্যানকে ছেড়ে নিলেন। ১৭৯৩ সালে হ্যানিম্যান এখানে হাসপাতাল গড়ে তুললেন এবং একাধিক মানসিক রোগগ্রস্ত রুগীকে সুস্থ করে তোলেন ।সেকাল মানসিক রুগীদের উপর কঠোর নির্যাতন করা হত।শারীরিক নির্যাতনকে চিকিৎসার প্রধান অঙ্গ বলে মনে করা হত।হ্যানিম্যান কঠোর ভাষায় এর নিন্দা করেন।

কিছুদিন মানসিক হাসপাতালে থাকার পর তিনি আবার অন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।ইতিমধ্যে তাঁর আটটি সন্তানের জন্ম হয়েছে।সংসার আর্থিক অনটন।কিন্তু তা সত্ত্বিও তাঁর গবেষণার কাজে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটেনি। একদিকে যেমন চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করতেন ,তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনে নিজেই বিভিন্ন ঔষুধ খেতেন।এতে বহুবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তা সত্ত্বেও কখনো গবেষণার কাজ থেকে বিরত থাকেননি।দীর্ঘ ছয় বছরের অক্লান্ত গবেষণার পর তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যথার্থই সাদৃশ্যকে সদৃশ আরোগ্য করে।

(similia similiabus curantur অর্থাৎ like cures likes)-এই ধারণা কোন অনুমান বা কল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এ সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য।

তাঁর এই আবিষ্কার ১৭৯৬ সালে সে যুগের একটি বিখ্যাত পত্রিকায় (Hufelad’s journal) প্রকাশিত হল। প্রবন্ধটির নাম দেওয়া হল “An essay on a new principle for ascertaining the curative powers of Drugs and some examination of the previous principal.”

এই প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন Every powerful medicinal ssubtance produces in the human body a peculiar kind of discase the more powerful the medicine, marked and violent the disease.

We should imitate nature which sometimes cures chronic disease by super adding another and employ in the (especially shronic) disease we wish to cure, that medicine which is able to produce another very similar artificial disease and the former will be cured.Similia-Similbus.

এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আধুনিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভিত্তি পত্তর করলেন হ্যানিম্যান-সেই কারণে ১৭৯৬ সালকে বলা হয় হোমিওপ্যাথিক জন্মবর্ষ। হোমিওপ্যাথিক শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক শব্দ হোমস। (Homoeos) এবং প্যাথস (Pathos) থেকে। সদৃশ এবং এর অর্থ রোগ লক্ষণের ‍সম লক্ষণ বিশিষ্ঠ ঔষুধ দ্বারা চিকিৎসা।

হ্যানিম্যানের এই যুগান্তকারী প্রবন্ধ প্রকাশের সাথে সাথে চিকিৎসা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হল।চিকিৎসা জগতের প্রায় সকলেই এই মতের ঘোরতর বিরোধী হয়ে উঠলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তীব্র সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে আরম্ভ করল। তাঁকে বলা হল অশিক্ষিত হাতুড়ে চিকিৎসা। নিজের আবিস্কৃত সত্যের প্রতি তাঁর এতখানি অবিচল আস্থা ছিল, কোন সমালোচনাতেই তিনি সামান্যতম বিচলিত হলেন না।

হ্যানিম্যান নিজেই শুরু করলেন বিভিন্ন ঔষুধের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তাঁর মনে হয়েছিল সুস্থ মানবদেহের উপর ঔষধ পরীক্ষা করেই তাঁর ফল উপলন্ধি করা সম্ভব। ঔষধের মধ্যে যে আরোগ্যকারী শক্তি আছে সেই বিষয়ে জ্ঞান অর্জণ করার অন্য কোন উপায় নেই। সাধারণ পরীক্ষায় বা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে কোন ঔষধের সাধারণ বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য বোঝা যায় কিন্তু মানুষের উপর কিভাবে তা প্রতিক্রিয়া করে তা জানাবার জন্যে  মানুষের উপরেই পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পরীক্ষার প্রয়োজনের নিজেই সমস্ত ঔষধ খেতেন। তারপর পরিবার লোকদের উপর তা পরীক্ষা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন চিকিৎসক হিসাবে রোগীর কোন ক্ষতি করবার তাঁর অধিকার নেই। এইভাবে একের পর এক ঔষধ পরীক্ষা করে যে জ্ঞান অর্জন করলেন তার ভিত্তিতে ১৮০৫ সালে লাটিন ভাষায় প্রকাশ করলেন Fragment-de-viribus নামে ২৭ টি ঔষধের বিবরণ সংক্রান্ত বই।এই বইটি প্রথম হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা বা ভেষজ লক্ষণ সংগ্রহ। চিকিৎসা জগতে মেটিরিয়া মেডিকার গুরুত্ব অপরিসীম।

তাঁরপর এককাপ গরম দুধ আর রাতের খাওয়া খেয়ে চলে যেতেন পড়ার ঘরে। মধ্যরাত, কোন কোন সময় শেষরাত অবধি চলত তাঁর রোগের বিবরণ লেখা,চিঠিপত্র লেখা, বই লেখা।

অবশেষ ১৮১০ সালে প্রকাশিত হল অর্গানন অব মেডিসিন(Organon of Medicine)।

এই অর্গাননকে বলা হয় হোমিওপ্যাথিক বাইবেল। এতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির নীতি ও বিধান সমূহের বিস্তুত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আর অকাট্য যুক্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন তাঁর প্রতিটি অভিমত। এতে হোমিওপ্যাথিক মূল নীতির আলোচনা ছাড়াও অন্যান্য চিকিৎসা প্রণালীর সাথে আলোচনা করে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও সে যুগে চিকিৎসার নামে যে ধরনের অমানুষিক কার্যকলাপ প্রচলিত ছিল তার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করলেন।

অর্গাননের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮১০ সালে। এই বই প্রকাশের সাথে সাথে সমালোচনা আর বিতর্কের ঝড় বইতে থাকে। তাঁর উপর শুরু হল নির্যাতন। হ্যানিম্যান জানতেন যাঁরাই নতুন কিছুর আবিস্কারক তাঁদের সকলকেই এই ধরনের অত্যাচার সইতে হয়।এই ব্যাপারে তিনি প্রথম ব্যক্তি নন,শেষ ব্যক্তিও নন।নিজের উপর তাঁর এতখানি আত্মবিশ্বাস ছিল তাই ১৮১৯ সালে যখন অর্গাননের দ্বিতীয় সংস্কার প্রকাশিত হয়, বইয়ের প্রথম তিনি লিখলেন Aude sapere এর অর্থ আমি নিজেকে বুদ্ধিমান বলে ঘোষণা করছি। এইভাবে তিনি তৎকালিন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ আর বিদ্রপ ফেটে পড়লেন। হ্যানিম্যানের জীবনকালে এর পাঁচটি সংস্কার প্রকাশিত হয়। প্রতিটি সংস্কারণেই তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো উন্নত থেকে উন্নতর রুপে বর্ণনা করেছেন।

১৮১০ সালে অর্গানন প্রকাশের সাথে সাথে হ্যানিম্যানের  বিরুদ্ধে একাধিক রচনা প্রকাশিত হল। হ্যানিম্যানের ছয়জন ছাত্রের বেআইনে ঔষধ তৈরি ও বিতরণের অভিযোগ আনা হল। একজন ছাত্রকে জেলে পোরা হল, তাঁর সমস্ত ঔষধ আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলা হল।

লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক হ্যানিম্যানের চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়োর অধ্যাপক পদে নিয়োগের একাংশ এই কাজে প্রবল বাধা সৃষ্টি করল। কিন্তু তাদের বাধাদান সত্ত্বেও হ্যানিম্যানকে বক্তৃতা দেবার জন্যে অনুমতি দেওয়া হল।

তাঁর এই বক্তৃতা শোনবার জন্য দলে দলে ছাত্ররা এসে ভিড় করল। সকলেই হ্যানিম্যানের নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে জানতে উৎসাহী,কৌতূহলী। তখন হ্যানিম্যান প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় পেীছে গিয়েছেন , তবুও তরুণ অধ্যাপকদের মত তেজদীপ্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে হোমিওপ্যাথিক তত্ত্বের বর্ণনা করতেন। কিন্তু ছাত্রদের মধ্যে কেউ তার অভিমত গ্রহণ করতে পারল না। কারণ তাদের মধ্যে প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে নতুন কিছুর গ্রহণ করবার মত মানসিকতা সৃষ্টি হয়নি। তা সত্ত্বেও সামান্য কয়েকজন ছাত্রকে শিষ্য হিসাবে পেলেন যারা উত্তরকালে তাঁর নব চিকিৎসা ব্যবস্থার ধারক-বাহক হয়ে উঠেছিল। এই সময় ফরাসি সম্রাট নেপালিয়নের সেনাবাহিনী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তাদের মধ্যে বহু সংখ্যক সৈন্য টাইফরড রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। কোন চিকিৎসাতেই তাদের রোগের প্রকোপ হ্রাস না পাওয়ায় হ্যানিম্যিানকে চিকিৎসার জন্যে ডাকা হয় । তিনি বিরাট সংখক সৈন্যকে অল্পদিনের মধ্যেই সুস্থ করে তোলেন। এতে তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ।অষ্টিয়ার যুবরাজ Schwarzenbreg পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছলেন। এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায় কোন উপকার না পেয়ে হ্যানিম্যানের চিকিৎসা জগতের সুনাম শুনে তাঁকে চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ করলেন। হ্যানিম্যানের চিকিৎসায় অল্পদিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।সামান্য সুস্থ হতেই হ্যানিম্যানের নির্দেশ অমান্য করে মদ্যপান করতে আরম্ভ করলেন। এতে হ্যানিম্যান ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর চিকিৎসা বন্ধ করে দিলেন এবং যুররাজের চিকিৎসার জন্য আর তাঁর প্রাসাদে গেলেন না। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই যুবরাজ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন।

এই ঘটনায় অষ্টিয়ানদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোপের সঞ্চার হল। এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা এই সুযোগে হ্যানিম্যানের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শুরু করল এবং যুবরাজের মৃত্যুর জন্য সরাসরি হ্যানিম্যানকে দায়ী করল। জার্মান সরকার হ্যানিম্যানের ঔষধ তৈরির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল।১৮২০ সালে ৭ ফেব্রয়ারি হ্যানিম্যানিকে আদালতে উপস্থিত হতে হল। আদালত তাঁর সমস্ত ঔষধ মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর।

হ্যানিম্যাস এর জবাবে শুধু বললেন, ভবিষ্যৎই এর সঠিক বিচার করবে।

সম্মিলিতভাবে চিকিৎসকরা তাঁর বিরোধিতা করতে আরম্ভ করল।তাঁকে লিপজিগ থেকে বহিস্কারের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠল। হ্যানিম্যান বুঝতে পারলেন আর তাঁর পক্ষে লিপজিগ থেকে বহিস্কারের জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠল। হ্যানিম্যান বুঝতে পারলেন আর তাঁর পক্ষে লিপজিগে থাকা সম্ভব নয়।তিনি নিরুপায় হয়ে ১৮২১ সালের জুন মাসে লিপজিগ ত্যাগ করে কিথেন শহরে এসে বাসা করলেন।

হ্যানিম্যানের জীবনের এই পর্যায়ে ঝঞ্বা বিক্ষুদ্ধ পালভাঙা নৌকার মত। সংসারে চরম অভাব। চারদিকে বিদ্বেষ আর ঘৃণা। প্রতি পদক্ষেপে মানুষের অসহযোগিতা আর বিরুদ্ধাচরণ।

এই প্রতিকূলতার মধ্যেও হ্যানিম্যান ছিলেন অটল, নিজের সংকল্পে পর্বতের মত দৃঢ়। অসাধারণ ছিল তাঁর মহত্ত্বতা। যে চিকিৎসকরা নিয়ত তাঁর বিরুদ্ধাচরণ  করত তাদের বিরুদ্ধেও কখনো কোন ঘৃণা প্রকাশ করেননি। একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন “চিকিৎসকরা আমার ভাই, তাদের কারোর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই।” আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন “ সত্যের বিরুদ্ধে এই নির্লজ্জ প্রচার মানুষের অজ্ঞাতারই প্রকাশ। এর দ্বারা হোমিওপ্যাথিক অগ্রগতি রোধ করা সমম্ভ নয়।

হোমিওপ্যাথিকর এই দুর্দিনে হ্যানিম্যানের পাশে এসে দাঁড়ালেন কিথেন শহরের ডিউক ফার্দিনান্দ।তিনি কিথেন শহরে শুধু বাস করার অনুমতি নয়, চিকিৎসা করারও অনুমতি দিলেন।হ্যানিম্যান তাঁর ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসা করবারও অনুমতি দিলেন। হ্যানিম্যান তারঁ ঔষধ প্রস্তুত ও চিকিৎসা করবার অনুমতির জন্য যখন ডিউকের কাছে আবেদন করলেন, সেই আবেদন পরীক্ষার ভার পড়ল আদম মূলারের উপর। হ্যানিম্যানের সাথে সাক্ষাতের অসাধরণ বিবরণ দিয়েছেন মূলার। “এই লাঞ্চিত অপমানিত মানুষটিকে দেখে চোখে জল এসে গেল। এই মানুষের দুঃখে আমার হৃদয় বেদনার্ত হয়ে উঠল। উপলদ্ধি করতে পারছিলাম আমার সামনে বসে আছে এই শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট চিকিৎসক, ভবিষ্যৎ কালই যার আবিস্কারের প্রকৃত মৃল্যায়ন করতে পারবে।

১৮২২ সালে হ্যানিম্যান প্রকাশ করলেন প্রথম হোমিওপ্যাথিক পত্রিকা। এর কয়েক বছর পর হ্যানিম্যান প্রকাশ করলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা chronic disease : Their nature and Homoeopathic treatment অর্থাৎ পুরাতন রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধীয় পুস্তক। চিকিৎসা জগতে এ এক যুগান্তকারী সংযোজন। পুরনো রোগের চিকিৎসা সম্বন্ধে  এমন বই ইতিপূর্বে কোথাও রচিত হয়নি। তিনি বললেন, সোরা (psory),সিফিলিশ (Syphislis) ও সাইকোসিস (Sycosis) মানবদেহের সর্ব রোগের কারণ। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকারক শক্তি হল সোরা। তাঁর অভিমতের বিরুদ্ধে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হল। এমকি হ্যানিম্যানের কিছু ছাত্র অনুগামীও তাঁর মতের বিরুদ্ধচারণ করে তাঁর সঙ্গে সমস্ত সর্ম্পক ছিন্ন করল। তা সত্ত্বেও বহু চিকিৎসক অনুভব করতে পারলেন হ্যানিম্যানের রচনার গুরুত্ব। কয়েকজন বিখ্যাত এলোপ্যাথিক চিকিৎসক হোমিওপ্যাথিক শিক্ষার জন্য হ্যানিম্যানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। আমেরিকা থেকে এলেন ডাঃ কন্সটেন্টাইন হেরিং,ইংল্যান্ড থেকে এলেন ডাক্তার কুইন। এরা সকলেই নিজের দেশে হোমিওপ্যাথির প্রচার-প্রসারে উল্লেখ্যোগ্য ভুমিকা দিয়েছিলেন।

১৮৩০ সালে হ্যানিম্যানের স্ত্রী হেনরিয়টা ৬৭ বছর বয়েসে মারা গেলেন। তিনি ১১ টি সন্তানের জননী।সমস্ত জীবনে হ্যানিম্যানের পাশে ছিলেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিণী। বাইবেল প্রতিকূলতার মাঝে হ্যানিম্যান যখন ক্লান্ত  অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন  সংসার জীবনে তখন অফুরন্ত শক্তি সাহস ভালবাসায় পূর্ণ  করে দিয়েছিলেন হেনরিয়টা। হ্যানিম্যানের জীবনের অন্ধকারময় দিন গুলিতেও হেনরিয়টা   ছিলেন তাঁর চলার সঙ্গি  ।হ্যানিম্যানের জীবনে যখন অন্ধকার দূর হয়ে আলোর আভা ফুটে উঠেছিল, হেনরিয়টা তখন চির অন্ধকারের জগতে হারিয়ে গেলেন।স্ত্রী অভাব, কন্যাদের ভালবাসা আর যত্নে ভুলে গেলেন হ্যানিম্যান। হ্যানিম্যানের খ্যাতি প্রতিপত্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল।রোগী দেখে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। এই সময়ে হ্যানিম্যানের জীবনে এল নতুন বসন্ত। তিনি তখন ৮০ বছরের বৃদ্ধ।

১৮৩৪ সালের ৮ অক্টোবার এক সুন্দরী যুবতী মাদাম মেলানি চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য হ্যানিম্যানের কাছে এলেন। মেলালি ছিলেন ফ্রান্সের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন আইনমন্ত্রীর পালিত কন্যা। হ্যানিম্যানের সাথে সাক্ষাতের সময় তাঁর বয়স ৩৫ বছর। মেলালি ছিল শিল্পী কবি।বয়েসের বিরাট ব্যবধান থাকা হয়ে গেল মেলালি হ্যানিম্যানকে ফ্রান্সে নিয়ে গেলেন। সরকারি ভাবে তাঁকে ডাক্তারি করবার অনুমতি দেওয়া হল।

যথার্থই তাঁর জীবনে ছিল পরিপূর্ণ সফলতা আর পূর্ণতার। সেই কারণেই তাঁর শিষ্য  ব্রেডফোর্ড শুরুর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞলি জানিয়ে লিখেছিলেন,তিনি ছিলেন  এমন একজন বিদ্বান যাঁকে বিদগ্ধ জগৎ সমাদৃত করেছে। এমন একজন রসায়বিদ যিনি রসায়ন বিশেষজ্ঞদের শিক্ষা দিতেন।বহু ভাষায় এমন এক পন্ডিত যাঁর অভিমতকে ভাষাতত্ত্ব বিদরা খন্ডন করতে সাহস পেত না। একজন দার্শনিক যাঁর দৃঢ় মতবাদ থেকে কেউ বিচ্যুত করতে পারেনি।

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 3 =