নীড় / মনীষীর জীবনী / ৯১. ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

৯১. ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

৯১. ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

[১৮২০-১৯১০]

১৮৫০ সাল। ক্রিমিয়ার প্রান্তরে ইংল্যান্ড ও রাশিয়ার যুদ্ধ চলেছে। দুই পক্ষেই শত শত সৈনিক নিহত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে কুটারিতে তৈরি হয়েছে আহত সৈনিকদের জন্য হাসপাতাল। মুমূর্ষু মানুষের আর্তনাদে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তার মাঝে চলেছেন। কোন ক্লান্ত নেই, বিরক্তি নেই। দু  চোখ জুড়ে বয়েছে ভালবাসা, স্নেহের পরশ। যখনই তিনি কারো পাশে গিয়ে দাঁড়ান, মুহূর্তে সে ভুলে যায় তার সব ব্যথা যন্ত্রণা।

সর্বপ্রথমে হাসপাতাল চত্বর পরিস্কার করবার জন্য ঝাডুন তোয়ালের প্রয়োজন দেখা দিল। সরকারী দপ্তরের যে কর্মচারীর কাছে এই সব ছিল, ফ্লোরেন্স বুঝতে পারলেন তা সংগ্রহ করতে গেলে আইনের নানা বেড়াজাল পেরিয়ে আসতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তিনি টাইমস তহবিলের কাছে আবেদন জানালেন। সেখানেও অনিয়ম। আহত সৈনিকদের জন্য পরিচ্ছন্ন পোশাক দরকার। নিরুপায় হয়ে ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে নিজেই একটি বিশাল লন্ড্রী খুলে ফেললেন, ততদিনে পোশাক তোয়ালে আসতে আরম্ভ করেছে। ফ্লোরেন্স আদেশ দিলেন মালের পেটি আসা মাত্রই যেন তা খুলে ফেলা হয়। আইনকানুন আর নিয়মের বেড়াজালে যেন এক মুহূর্ত বিলম্ব না হয়।

ফ্লোরেন্সের আত্মত্যাগ কর্মনিষ্ঠা ভালবাসা মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকে। সকলেই কর্মতৎপর হয়ে ওঠে।

হাসপাতাল পরিস্কার করে আহত সৈনিকদের যত্নের দিকে মনোযোগ দিলেন ফ্লোরেন্স। এতদিন বাহিনীর হাসপাতাল যে পদ্ধতিতে পরিচালিত হত তিনি তার আমূল পরিবর্তন করলেন। সে সমস্ত কর্মচারীরা হাসপাতালের কাজের উপযুক্ত নয় বিবেচনা করলেন, তিনি তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন দয়ার প্রতিমূর্তি অন্যদিকে কঠিন কঠোর। কাজের সামান্যতম বিশৃঙ্খলা বিচ্যুতি সহ্য করতে পারতেন না।

ফ্লোরেন্স স্কুটারিতে পৌছবার কয়েকদিন পর এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “সেই সমস্ত অফিসারদের প্রতি আমার কিছু সহানুভূতি আছে যারা আমার ক্রমাগত চাহিদা পূরণ করতে করতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই সমস্ত লোক যারা মানুষের মৃত্যু মেনে নিতে পারবে কিন্তু সরকারী কেতা- কানুন ভেঙে একটি ঝাঁটা দেবে না-তাদের ‍প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতি নেই।”

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রাথমিক কাজকর্ম শেষ করে সমস্ত হাসপাতালকে ঢেলে সাজাবার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতালের কর্মচারীদের স্বতন্ত্র দল তৈরি করে তাদের উপর জিনিসপত্র কেনার ভার পড়ল, কারোর উপর সমস্ত হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা, কারো উপর রুগীদের পোশার-পরিচ্ছদের দায়িত্ব দেওয়া হল। শুধুমাত্র দায়িত্বভার আরোপ করেই নিশ্চিত হলেন না ফ্লোরেন্স। যাতে প্রত্যেককে আপন আপন কর্ম দায়িত্বভার আরোপ করেই নিশ্চিন্ত হলেন না ফ্লোরেন্স। যাতে প্রত্যেককে আপন আপন কর্ম দায়িত্বভার সুষ্ঠুভাবে পালন করে তার দিকে প্রতি মুহূর্তে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।দিনের শেষে সকলের কাজের বিশ্লেষণ করতেন, ভুল-ত্রুটি দূর করে আরো কর্মদক্ষ হয়ে উঠবার পরামর্শ দিতেন। অল্প কিছুদিনে মধ্যেই সমগ্র হাসপাতালের চেহারা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হল। শুধু তাই নয়, নতুন কয়েকটি ওয়ার্ড খোলা হল।চার মাইল অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠল এই হাসপাতাল। ফ্লোরেন্স ছিলেনে এই্ হাসপাতালের এক সেবার প্রতিমূর্তি। দিন-রাত্রির প্রায় সবটুকু অংশই তাঁর কেটে যেত এই হাসপাতালের আঙিনায়। কখনো তিনি আহতদের ক্ষতস্থান পরিস্কার করে ব্যন্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন, কখনো তাদের পোশাক পরিয়ে দিচ্ছেন। আবার সহকর্মীদের হাতে হাত লাগিয়ে হাসপাতাল আঙিনা পরিস্কার করছেন। রুগীদের জন্য খাবার তৈরি করছেন। আবার তিনিই রাতের গভীরে সকলে যখন ঘুমিয়ে আছে, প্রদীপ হাতে রুগীদের বিছানার পাশে ঘুরে বেড়াতেন। রুগীরা মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে দেখত। তাদের মনে হত এক মূর্তিময়ী দেবী যেন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সব দুঃখ যন্ত্রণা মুহূর্তে ভুলে যেত তারা। একজন সৈনিক লিখেছেন যখন তিনি আমাদের পাশ দিয়ে হাঁটতেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দে আমাদের সমস্ত মনপ্রাণ ভরে উঠত। তিনি প্রত্যেকটি বিছানার পাশে এসে দাঁড়াতেন। কোন কথা বলতেন না, শুধু মুখে ফুটে উঠত মৃদু হাসি। তারপর তিনি যখন আমাদের অতিক্রম করে যেতেন, তাঁর ছায়া পড়ত আমাদের শয্যার উপর। সৈনিকরা পরম শ্রদ্ধার সেই ছায়াকেই চুম্বন করত। তারা বলত ‘দীপ হাতে রমণী’। এই নামেই তিনি সমস্ত পৃথিবীর মাঝে অমর হয়ে রইলেন। যুদ্ধ যতই এগিয়ে চলল তাঁর কর্মভার বেড়েই চলল। যুদ্ধের প্রয়োজনে যেখানে যত হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল, সব হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। তাঁর আন্তরিক চেষ্টায় মৃত্যুর হার হাজারে ষাট থেকে তিনি এসে দাঁড়াল।

তবুও বিশ্রাম নেই ফ্লোরেন্সর। শুধু আহত মানুষের দেহের সুস্থতা নয়, মনের আনন্দের ব্যবস্থা করতেও তিনি সচেষ্ট হয়ে উঠলেন। আহত সৈনিকরা  যাতে নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারে, তিনি তার ব্যবস্থা করলেন। প্রতিটি হাসপাতালে গড়ে তুললেন লাইব্রেরি। সেখানে আমোদ-প্রমোদের জন্য শুধু বই ছাড়াও বিভিন্ন সংবাদপত্র আনার ব্যবস্থা করলেন। হাসপাতাল ব্যবস্থার সমস্ত চেহারাটাই পরিবর্তিত হয়ে গেল। এতদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে জন্ম নিল নতুন সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার। শুধু হাসপাতাল নয়, বহুবার তিনি গিয়েছেন যুদ্ধের প্রান্তরে। বুঝেছিলেন শুধু অস্ত্র বা সামরিক শিক্ষা একজন সৈনিককে তার দক্ষতার চরম শিখরে পৌছে দিতে পারে না। তাদের জন্যেও পাঠাতেন গরম খাবার, নানান বই । এই অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁর শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল, মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। একবার এত অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ডাক্তাররা প্রায় তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করেছিল। কিন্তু তাঁর অদম্য মনোবল, জীবনীশক্তির তাগিদে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু সকলের সমস্ত অনুরোধই ‍তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, যতক্ষণ না শেষ আহত সৈনিকটি দেশে  প্রত্যাবর্তন করছে ততক্ষণ তাঁর পক্ষে স্কুটারি ত্যাগ করা সম্ভব নয়।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের এই অজেয় মনোভাবের জন্য সমস্ত ইংল্যান্ড তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় প্রশংসায় মুখরিত হয়ে ওঠে। মহারানী ভিক্টোরিয়া তাঁকে লিখলেন, “যেদিন আপনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন সেই দিনটি আমার কাছে বিরাট আনন্দের দিন কারণ সমস্ত নারী জাতিকে আপনি সুমহান গৌরবে মহিমান্বিত করেছেন। আপনার সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক প্রার্থনা করি।”

অবশেষে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৮৫৬ সাল, দীর্ঘ দু বছর আহত সৈনিকদের সেবার করে ফ্লোরেন্স নাইর্টিঙ্গেলে ফিরে চললেন তাঁর সম্মানে ব্রিটিশ সরকার একটি আলাদা জাহাজ পাঠাতে চাইলেন। কিন্তু সে অনুরোধ তিনি ‍প্রত্যাখ্যান করলেন, সকলের সাথেই দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সমস্ত দেশ তাঁকে বিপুল সম্মান জানাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সবিনয়ে সব কিছুকে প্রত্যাখ্যান করলেন সামান্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল না। শুধুমাত্র মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মধ্যে তিনি শুধু নিজেকে একজন সেবিকা নিয়ম ভেঙে নারীকে দিলেন সম্মানের আসন। প্রচলিত কুসংস্কারে নিগড় ভেঙে সেবার কাজকে (Nursing) মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কিন্তু তখনো তাঁর কাজ শেষ হয়নি। তাঁর আদর্শ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিল।

ফ্লোরেন্সের ইচ্ছা ছিল দেশে প্রথম নার্সিং স্কুল স্থাপন করবেন। সমগ্র ইংল্যান্ডের মানুষ তাঁকে সম্মান জানাতে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড অর্থ তুলে দিল। সেই অর্থে ১৮৫৯ সালে সেন্ট টমাস হাসপাতালে তৈরি হল প্রথম নার্সিং স্কুল, “নাইটিঙ্গেল হোম” যা আধুনিক নার্সিং শিক্ষার প্রথম পাঠগৃহ।

শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই স্কুলের পঠন-পাঠন পরিচালনা বিধি ব্যবস্থা নিজেই নিরূপন করতেন। নার্সিং শিক্ষার সাথে সাথে সামরিক চিকিৎসা সম্বন্ধেও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। ১৮৫৮ সালে তিনি প্রকাশ করলেন আটশো পাতার একখানি বিবরণী, Note on matters affecting the health, efficiency and Hospital Administration of the British Army. এছাড়া তিনি নার্সিং- এর উপর একাধিক বই লিখলেন।

শুধু র্নাসিং নয়, হাসপাতাল পরিচালনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তাঁর মূল্যবান পরামর্শ শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও গ্রহণ করতে থাকেন। সমগ্র হাসপাতাল পরিচালন ব্যবস্থার তিনি আমূল পরিবর্তন করেন। ভারতবর্ষ সম্বন্ধেও ফ্লোরেন্সের আগ্রহ ছিল গভীর। সিপাই বিদ্রোহের সময় তিনি ভারতবর্ষে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

ফ্লোরেন্সের দেহের কর্মক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে আসছিল। একসময় শারীরিক দিক থেকে সর্ম্পূণভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন তিনি। এরপরেও বহু বছর বেঁচেছিলেন তিনি। রোগ যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে তাঁর অন্তরে জেগে থাকত এক গভীর আনন্দ। তিনি তাঁর জীবিতকালেই প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শিক্ষা, সাধনা ব্যর্থ হয়নি। দেশে দেশে গড়ে উঠছে নার্সিং স্কুল। যে পেশা একদিন ছিল ঘৃণিত তাই হয়ে উঠেছে পরম সম্মানের। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নার্সিংকে জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করছে।

জীবিতকালে বহু সম্মান পেয়েছেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। কিন্তু তাঁর আদর্শের বাস্তব রূপ দেখে যে আনন্দ পেয়েছেন তার চেয়ে বড় পাওয়া তাঁর কাছে আর কিছুই ছিল না।

অবশেষে ১৯১০ সালের ১৩ই আগস্ট এই মানব দরদী মহীয়সী নারীর মৃত্যু হয়।

সম্বন্ধে ডলি খাতুন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − one =