নীড় / মনীষীর জীবনী / ২৫. চার্লস ডারউইন্
Charls-Darwin

২৫. চার্লস ডারউইন্

২৫. চার্লস ডারউইন্
(১৮০৯-১৮৮২)

ডারউইনের জন্ম হয় ১৮০৯ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি  ইংল্যান্ডের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে । পিতা ছিলেন নামকরা চিকিৎসক । মাত্র আট বছর বয়েসে মাকে হারালেন ডারউইন । সেই সময় থেকে পিতা আর বড় বোনদের স্নেহচ্ছায়ায় বড় হয়ে উঠতে লাগলেন । নয় বছর বয়েসে স্কুলে ভর্তি হলেন । চিরাচরিত পাঠ্যসূচির মধ্যে কোন আনন্দই পেতেন না । তিনি লিখেছেন, বাড়িতে তাঁর ভাই একটি ছোট ল্যাবরেটরি গড়ে তুলেছিলেন । সেখানে তিনি রসায়নের নানান মজার খেলা খেলতেন ।

ষোল বছর বয়েসে চার্লসকে ডাক্তারি পড়ার জন্য এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেওয়া হল । যাঁর মন প্রকৃতির রুপ রস গন্ধে পূর্ণ হয়ে আছে, মরা দেহের হাড় অস্থি মজ্জা তাঁকে কেমন করে আকর্ষণ  করবে । ঔষধের নাম মনে রাখতে পারতেন না । শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গের বিবরণ পড়াতে বিরক্তি বোধ করতেন । আর অপারেশনের কথা শুনলেই আঁতকে উঠতেন ।

চার্লসের পিতা বুঝতে পারলেন ছেলের পক্ষে ডাক্তার হওয়া সম্ভব নয় । তাকে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি করা হল । উদ্দেশ্য ধর্মযাজক করা ।

সেই সময় কেমব্রিজের উদ্ভিদ বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন হেনসলো(Henslow) । হেনসলোর সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই তাঁর অনুরাগী হয়ে পড়লেন চার্লস ।  অল্পদিনের মধ্যেই গুরু-শিষ্যের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠল ।

কেমব্রিজ থেকে পাশ করে তিনি কিছুদিন ভূবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন । অপ্রত্যাশিতভাবে চার্লস ডারউইনের জীবনে এক অযাচিত সৌভাগ্যের উদয় হল । অধ্যাপক হেনসলোর কাছ থেকে একখানি পত্র পেলেন ডারউইন । ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বিগল(H. M.S.Beagle) নামে একটি জাহাজ দক্ষিণ আমেরিকা অভিযানে বার হবে । এই অভিযানের প্রদান হলেন ক্যাপ্টেন ফিজরয় । এই অভিযানের উদ্দেশ্য হল প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীবজন্তু, গাছপালা সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করা এবং বৈশিষ্ট্যকে পর্যবেক্ষণ করা । এই ধরনের কাজে বিশেষজ্ঞ এবং অনুরাগী ব্যক্তিরাই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে ।

এই অভাবনীয় সৌভাগ্যের সুযোগকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলেন না ডারউইন । ১৮৩১ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর “বিগল” দক্ষিণ আমেরিকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করল ।

ক্যাপ্টেন ফিজরয়ের নেতৃত্বে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জাহাজ ভেসে চলল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে । দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ছাড়াও গালাপগোস দ্বীপপুঞ্জ, তাহিতি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মালদ্বীপ, সেন্ট হেলেনা দ্বীপে জাহাজ ঘুরে বেড়াল । এই সময়ের মধ্যে ডারউইন ৫৩৫ দিন কাটিয়েছিলেন সাগরে আর ১২০০ দিন ছিলেন মাটিতে ।

ডারউইন যা কিছু প্রত্যক্ষ করতেন তার নমুনার সাথে সুনির্দিষ্ট বিবরণ, স্থান, সংগ্রহের তারিখ লিখে রাখতেন । কোন তত্ত্বের দিকে তাঁর নজর ছিল না । বাস্তব তথ্যের প্রতিটি ছিল তাঁর আকর্ষণ । ২৪ শে জুলাই ১৮৩৪ সাল । ডারউইন লিখেছেন “ইতিমধ্যে ৪৮০০ পাতার বিবরণ লিখেছি, এর মধ্যে অর্ধেক ভূবিদ্যা, বাকি বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তুর বিবরণ ।”

“বিগল” জাহাজে চড়ে দেশভ্রমণের সময় মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন । দীর্ঘ পাঁচ বছর পর যখন ১৮৩৬ সালে ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করলেন ডারউইন তখন তাঁর শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়েছে । কিন্তু অদম্য মনোবল,  বাড়ির সকলের সেবায় অল্প দিনেই সুস্থ হয়ে উঠলেন ।

এই সময় তিনি তাঁর কাজিন এম্মা ওয়েজউডকে বিবাহ করেন । বিবাহের সূত্রে বেশ কিছু সম্পত্তি লাভ করেন ডারউইন । এম্মার গর্ভের ডারউইনের দশটি সন্তান জন্মায় । শুধু মা হিসাবে নয়, স্ত্রী হিসাবেও এম্মা ছিলেন অসাধারণ ।

ডারউইনের পরবর্তী বই এক ধরনের সামুদ্রিক গুগলিদের নিয়ে । এই বইটি লিখতে ডারউইনের সময় লেগেছিল আট বছর । এই সময় তাঁর মনোজগতে এক নতুন চিন্তার জন্ম হচ্ছিল । যদিও সুদীর্ঘ দিন পর্যস্ত তা ছিল অসংলগ্ন বিশৃঙ্খল । কিন্তু নিরলস পরিশ্রম, অধ্যাবসায়, বিশ্লেষণ, গবেষণার মধ্যে দিয়ে তারই মধ্যে থেকে সৃষ্টি হচ্ছিল এক নতুন মতবাদ-বিবর্তনবাদ ।

ডারউইন প্রথমে তাঁর বিবর্তনবাদের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেন । ১৮৪২ সালে এরই বিস্তৃতি ঘটে ৩৫ পাতার একটি রচনার মধ্যে । দু বছর পর অপেক্ষাকৃত বিস্তারিতভাবে প্রস্তুত করলেন বিবর্তনবাদের উপর ২৩০ পাতার পান্ডুলিপি । এরপর শুরু হল পান্ডুলিপি সংশোধনের কাজ । তাতে নতুন তথ্য সংযোজন করা প্রতিটি তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ করা, তাকে আরো যুক্তিনিষ্ঠ করা । সুদীর্ঘ পনেরো বছর ধরে চলেছিল এই সংশোধন পর্ব ।

এইবার ডারউইন বইলেখার কাজে হাত দিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি গবেষণার কাজ যতখানি ভালবাসতেন, লেখালেখি করতে ততখানিই বিরক্তি বোধ করতেন ।

অবশেষে ২৪ শে নভেম্বর ১৮৫৯ সালে ডারউইনের বই প্রকাশিত হল । বই-এর নাম The origin of species by means of Natural Selection or the preservation of Favoured Races in the struggle for life. ( পরবর্তীকালে এই বই শুধু origin of species নামে পরিচিত হয় ।

প্রকাশের সাথে সাথে ১২৫০ কপি বই বিক্রি হয়ে গেল । বিবর্তনবাদের নতুন তত্ত্ব বাইবেলের আদম ইভের কাহিনী, পৃথিবীর সৃষ্টির কাহিনীকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত করলেন । এই বইতে তিনি লিখেছেন, আমাদের এই পৃথিবীতে প্রতিমুহূর্তে নতুন প্রাণের জন্ম হচ্ছে । জীবের সংখ্যা ক্রমাগতই বেড়ে চলেছে । কিন্তু খাদ্যের পরিমাণ সীমাবদ্ধ । সেই কারণে নিয়ত জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে চলেছে অস্তিত্ত্ব রক্ষার জন্য বিরামহীন প্রতিযোগিতা । যারা পরিবেশের সাথে নিজেদের সামঞ্জস্য বিধান করতে পেরেছে তারাই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছে । কিন্তু যারা পারেনি তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে । এই ধারাকেই বলা হয়েছে যোগ্যতমের জয় “ Survival of the Fittest” ।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রকৃতিক পরিবেশেরও পরিবর্তন হচ্ছে । সমুদ্রের মধ্যে জন্ম হচ্ছে স্থলভাগের, কত স্থলভাগ হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রগর্ভে । আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, অরণ্য ধ্বংস হচ্ছে । এই পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রাণেরও পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে সঠিক নির্বাচন ।

ডারউইনের মতবাদ এই পরিবর্তনশীলতা, বংশগতি এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর প্রতিষ্ঠিত । প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে প্রাণী পরিবেশের সাথে নিজেকে সামঞ্জস্য বিধান করে । জীবের সুবিধার জন্য এই পরিবর্তন তাদের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটায়, সৃষ্টি করে নতুন প্রজাতির ।

The origin of specie প্রকাশিত হওয়ার পর ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে আরো উন্নতভাবে প্রকাশ করবার জন্য ১৮৬৮ সালে প্রকাশ করলেন Variation of Animals and plant under Domestication । ১৮৭১ সালে প্রকাশিত হল ডারউইনের আর একখানি বিখ্যাত রচনা The Descent of Man .

প্রাণে বিকাশ বৃদ্ধির সাথে সাথে তার অস্তিত্ত্বের সংকট দেখা দিচ্ছে । প্রকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্যতমের জয় হচ্ছে । এক প্রজাতি থেকে জন্ম নিচ্ছে আরেক প্রজাতি । প্রাণী প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করছে এক স্তর থেকে আরেক স্তরে । ডারউইনের মত অনুসারে মানুষ নিম্নতর জীব থেকে ধাপে ধাপে উন্নত জীবের স্তরে এসে পৌঁছেছে । এই ক্রমবিবর্তনের চিত্রই তিনি এঁকেছেন তার The Descent of Man গ্রন্থে ।

ডারউইনের বিবর্তনবাদের প্রসঙ্গে অনেকের ধারণা মানুষের উৎপত্তি বাঁদর থেকে । কিন্তু ডারউইন কখনো এই ধরণের কথা বলেননি । তাঁর অভিমত ছিল মানুষ এবং বাঁদর উভয়েই কোন এক প্রাগঐতিহাসিক জীব থেকে বিবর্তিত হয়েছে । বাঁদররা কোনভাবেই আমাদের পূর্বপুরুষ নয়, তার চেয়ে দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলা যেতে পারে ।

ডারউইনের মতে মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব কারণ সমস্ত জীব জগতের মধ্যে যে সকলের চেয়ে বেশি যোগ্যতম । প্রকৃতপক্ষে মানুষ কোন স্বর্গচ্যুত দেবদূত নয়, সে বর্বরতার স্তর থেকে উন্নত জীব । এগিয়ে চলাই তার লক্ষ্য । তিনি যখন শেষ বারের মত লন্ডনে এসেছিলেন তখন তাঁর বয়স ৭৩ বছর । এক বন্ধুর বাড়ির দরজার সামনে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন । বন্ধু বাড়িতে ছিলেন না । বন্ধুর বাড়ির চাকর ছুটে আসতেই ডারউইন বললেন, তুমি ব্যস্ত হয়ো না, আমি একটা গাড়ি ডেকে বাড়ি চলে যেতে পারব । কাজের লোককে কোনভাবে বিব্রত না করে ধীরে ধীরে নিজের বাড়িতে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন । আর বিছানা থেকে উঠতে পারেননি তিনি । ক্রমশই তাঁর অসুস্থতা বেড়ে চলল । ডারউইন বুঝতে পারছিলেন তাঁর দিন শেষ হয়ে আসছে । তিন মাস অসুস্থ থাকার পর ১৯ শে এপ্রিল ১৮৮২ সাল, পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন চার্লস রবার্ট ডারউইন । তাঁর মৃত্যুতে দেশ জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এল । শত্রুরা উল্লসিত হয়ে উঠল, “তাঁর মত ঈশ্বর- বিদ্বেষী পাপীর স্থান হবে নরকে ।”

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − thirteen =