নীড় / মনীষীর জীবনী / ১২. আর্কিমিডিস
Archimedis

১২. আর্কিমিডিস

১২. আর্কিমিডিস
(২৮৭-২১২খ্রীস্ট পূর্ব)

সাইরাকিউসের সম্রাট হিয়েরো এক স্বর্ণকারকে দিয়ে একটি সোনার মুকুট তৈরি করেছিলেন । মুকুটটি হাতে পাওয়ার পর সম্রাটের মনে হল এর মধ্যে খাদ মিশানো আছে । কিন্তু স্বর্ণকার খাদের কথা অস্বীকার করল । কিন্তু সম্রাটের মনের সন্দেহ দূর হল না । তিনি প্রকৃত সত্য নিরূপণের ভার দিলেন রাজদরবারের বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের উপর ।

মহা ভাবনায় পড়ে গেলেন আর্কিমিডিস । সম্রাটের আদেশে মুকুটের কোন ক্ষতি করা যাবে না । আর্কিমিডিস ভেবে পান না মুকুট না ভেঙে কেমন করে তার খাদ নির্ণয় করবেন । কয়েকদিন  কেটে গেল । ক্রমশই অস্থির হয়ে ওঠেন আর্কিমিডিস । একদিন দুপুরবেলায় মুকুটের কথা ভাবতে ভাবতে সমস্ত পোশাক খুলে চৌবাচ্চায় স্নান করতে নেমেছেন । পানীতে শরীর ডুবতেই আর্কিমিডিস লক্ষ্য করলেন কিছুটা পানি চৌবাচ্চা থেকে উঠে পড়লেন । তিনি ভুলে গেলেন তাঁর শরীরে কোন পোশাক নেই । সমস্যা সমাধানের আনন্দের নগ্ন অবস্থাতেই ছুটে গেলেন রাজ দরবারে ।

মুকুটের সমান ওজনের সোনা নিলেন । একপাত্র পানিতে মুকুটটি ডোবালেন । দেখা গেল খানিকটা পানি উপছে পড়ল । এইবার মুকুটের ওজনের সমান সোনা নিয়ে জলপূর্ণ পাত্রে ডোবানো হল । যে পরিমাণ পানি উপছে পড়ল তা ওজন করে দেখা গেল আগের উপছে পড়া পানি থেকে তার ওজন আলাদা । আর্কিমিডিস বললেন, মুকুটে খাদ মেশানো আছে । কারণ যদি মুকুট সম্পূর্ণ সোনার হত তবে দুটি ক্ষেত্রেই উপছে পড়া পানির ওজন সমান হত ।

এই আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হল একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র । “তরল পদার্থের মধ্যে কোন বস্তু নিমজ্জিত করলে সেই বস্তু কিছু পরিমাণে ওজন হারায় । বস্তু যে পরিমাণে ওজন হারায় সেই পরিমাণ ওজন বস্তুর অপসারিত তরল পদার্থের ওজনের সমান।” এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আর্কিমিডিসের সূত্র নামে বিখ্যাত ।

আর্কিমিডিসের জন্ম আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ২৮৭ সালে । সিসিলি দ্বীপপুন্জ্ঞের অন্তর্গত সাইরাকিউস দ্বীপে । পিতা ফেইদিয়াস ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ ।

কৈশোর ও যৌবনে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় গিয়ে পড়াশুনা করেছেন । সেই সময় আলেকজান্দ্রিয়া ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পীঠস্থান । ছাত্র অবস্থাতেই আর্কিমিডিস তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সমধুর ব্যক্তিত্বের জন্য সর্বজন পরিচিত হয়ে ওঠেন । তাঁর গুরু ছিলেন ক্যানন । ক্যানন ছিলেন জ্যামিতির জনক মহান ইউক্লিডের ছাত্র ।পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি চেয়েছিলেন গণিতবিদ হবেন । অঙ্কশাস্ত্র, বিশেষ করে জ্যামিতিতে তাঁর আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি । ইউক্লিড, ক্যানন যেখানে তাঁদের বিষয় সমাপ্ত করেছিলেন আর্কিমিডিস সেখান থেকেই তাঁর কাজ আরম্ভ করেন ।

আর্কিমিডিস যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন । কারো আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করাও তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল । কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন সাইরাকিউসের প্রজা, সম্রাট হিয়েরার রাজকর্মচারী তাই নিরুপায় হয়েই তাঁকে সম্রাটের আদেশ মেনে চলতে হত ।

সম্রাটের আদেশই তিনি প্রায় ৪০ টি আবিষ্কার করেন । তার মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে জিনিস হলেও অধিকাংশই ছিল সামরিক বিভাগের প্রয়োজন ।

আর্কিমিডিসের একটি আবিষ্কার পুল ও লিভার । একবার কোন একটি জাহাজ চরায় এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে তাকে আর কেনভাবেই পানিতে ভাসানো সম্ভব হচ্ছিল না । আর্কিমিডিস ভালভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করলেন । তাঁর মনে হল একমাত্র যদি এই জাহাজটাকে উঁচু করে তোলা যায় তবেই জাহাজটাকে পানিতে ভাসান সম্ভব । আর্কিমিডিসের কথা শুনে সকলে হেসেই উড়িয়ে দিল ।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই উদ্ভাবন করলেন লিভার আর পুলি । জাহাজঘাটে এটা উঁচু জায়গার লিভার খাটাবার ব্যবস্থা করলেন । তার মধ্যে বিরাট একটা দড়ি বেঁধে দিলেন । দড়ির একটা প্রান্ত জাহাজের সঙ্গে আষ্টে-পিষ্টে বাঁধা হল ।

এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে সম্রাট হিয়েরো নিজেই এলেন জাহাজ ঘাটায় । নগর ভেঙে যেখানে যত মানুষ ছিল সকলে জড় হয়েছে । আর্কিমিডিস সম্রাটকে অনুরোধ করলেন লিভার লাগানো দড়ির আরেকটা প্রান্ত ধরে টানতে । আর্কিমিডিসের কথায় সম্রাট তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়িটা ধরে টান দিলেন । সাথে সাথে অবাক কান্ড । নড়ে উঠল জাহাজটা । চারদিকে চিৎকার উঠল । এবার সম্রাটের সাথে দড়িতে হাত লাগালেন আরো অনেকে । সকলে মিলে টান দিতেই সত্যি সত্যি জাহাজ শূন্যে উঠতে আরম্ভ করল । সম্রাট আনন্দে বুকে জুড়িয়ে ধরলেন আর্কিমিডিসকে ।

এই আবিষ্কারের ফলে বড় বড় পাথর, ভারী জিনিস, কুয়া থেকে জল তোলার কাজ সহজ হল । একবার আর্কিমিডিস গর্ব করে বলেছিলেন, আমি যদি পৃথিবীর বাইরে দাঁড়াবার একটু জায়গা পেতাম তবে আমি আমার এই লিভার পুলির সাহায্যে পৃথিবীটাকেই নাড়িয়ে দিতাম ।

সৈনিকটি বলে উঠল, তুমি আমার সঙ্গে চল, আমাদের সেনাপতি তোমার খোঁজ করছেন ।
বৃদ্ধ আর্কিমিডিস বলে উঠলেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি । কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারব না ।

এ ধরণের কথা শোনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না রোমান সৈন্যটি । তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তাকে তা পালন করতেই হবে । আর্কিমিডিসের হাত ধরতেই এক টানে ছাড়িয়ে নিলেন আর্কিমিডিস ।

আমার কাজ শেষ না হলে কোথাও যেতে পারব না ।

আর সহ্য করতে পারল না সৈনিক । পরাজিত দেশের এক নাগরিকের এতদূর স্পর্ধা, তার হুকুম অগ্রাহ্য করে ! একটানে কোমরের তলোয়ার বার করে ছিন্ন করল মহা বিজ্ঞানীর দেহ । রক্তের ধারায় শেষ হয়ে গেল তাঁর অসমাপ্ত কাজ ।

আর্কিমিডিসকে হত্যা করা হয়েছিল সম্ভবত খ্রীস্টপূর্ব ২১২ সালে ।  বিজ্ঞানীর ছিল মুন্ডু দেখে গভীরভাবে দুঃখিত হয়েছিলেন মার্কিউলাস । তিনি মর্যাদার সাথে আর্কিমিডিসের দেহ সমাহিত করেন ।

মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের আবিষ্কার সম্বন্ধে সঠিক কোনতথ্য জানা যায় না । সামরিক প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করলেও ঐ বিষয়ে তার কোন আগ্রহ ছিল না । মূলত গাণিতিক বিষয়েই ছিল তাঁর আগ্রহ । দিনের অধিকাংশ সময়েই তিনি গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন । বাইরের জগতের সব কথাই তিনি তখন ভুলে যেতেন । এমন বহু সময় গিয়েছে তাঁর কাজের লোক তাঁকে খাবার দিয়ে গিয়েছে, সারাদিনে তিনি সেই কাবার স্পর্শই করেননি । ভুলেই গিয়েছেন খাবার কথা । আবার কখনো স্নান করতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সেখানেই কাটিয়ে দিতেন । খোঁজ করতে দেখা গেল তিনি স্নানাগারের দেওয়ালেই অঙ্ক কষে চলেছেন । বলবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর রচনার সংখ্যা বারোটি । এছাড়াও তিনি আর যে সমস্ত রচনা করেছিলেন তার কোন সন্ধান পাওয়া যায় না ।

গণিত সংক্রান্ত ব্যাপারে আর্কিমিডিসের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল ———
(১) বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত ৩10/৭১ ও ৩1/৭ এর মধ্যে অবস্থিত ।
(২) অধিবৃত্তীয় অংশগুলোর ক্ষেত্রফল নির্ধারণ করেছিলেন ।
(৩) শঙ্ককৃতি এবং গোলাকৃতি বস্তুর সম্বন্ধে ৩২ টি প্রতিজ্ঞা উদ্ভাবন করেছিলেন ।
(৪) বলবিদ্যার তত্ত্বের ভীত হিসাবে সমতল ক্ষেত্রের সাম্যতা সম্বন্ধে তত্ত্ব নির্ধারণ করেন ।

তাঁর বহু আবিষ্কৃত সত্য আজও বিজ্ঞানীদের পথ নির্দেশ করে । ‍

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =