নীড় / মনীষীর জীবনী / ১৪. আল ফারাবী
Al-Farabi

১৪. আল ফারাবী

১৪. আল ফারাবী
(৮৭০-৯৬৬খ্রিঃ)

মুসলিম জাতির বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাদের অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানে না । জানার তেমন আগ্রহ ও নেই । আগ্রহ থাকলেও জানার তেমন কোন পথ ও পাথেয় নেই । রাষ্ট্রশক্তি হারা মুসলমানরা তাদের অতীত ঐতিহ্য  ও জ্ঞান বিজ্ঞানকে ধরে রাখতে পারেনি । মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা করে অমুসলিম বিশ্ব আজ উন্নত । অন্যদিকে বর্তমান মুসলিম বিশ্ব তাদের পূর্ব পুরুষদের দেয়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে  হারিয়ে আজ মূর্খ ও পরনির্ভরশীল জাতিতে হয়েছে পরিণত । এমন এক যুগ ছিল যখন সমগ্র বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল মুসলমানদের হাতে । জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য ও সভ্যতায় মুসলিম জাতি ছিল উন্নত ও শ্রেষ্ঠ । আল্লাহ পাকের আশীর্বাদে মুসলিম জাতির মধ্যে ধন্য মানুষের জন্ম হয়েছিল, যারা ছিল ঐশী জ্ঞানে মহিমান্বিত ।তাঁদের মধ্যে এবং মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত সম্পর্কে হতভাগা মুসলমানদের অনেকেই জানে না । না জানাটাও অস্বাভাবিক নয় । কারন মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আজ বিকৃত করে রচনা করা হয়েছে । এছাড়া ইউরোপীয় পন্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের অধিকাংশের নামই বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে । তাই বর্তমান প্রজন্মের জানতে হতে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল হারানো দিনগুলি সম্পর্কে এবং বিভিন্ন মুসলিম মনীষীদের দেয়া জ্ঞান বিজ্ঞান ও আবিষ্কার সম্পর্কে । অগ্নিপুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী বাঙালি মুসলমানদের চোখের সামনে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস তুলে ধরার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন । তিনি তাঁর ‘স্পেন বিজয়’ কাব্য গ্রন্থে যথার্থ লিখেছেন—–

“গাবো সে অতীত কথা,গৌরব কাহিনী,
নাচাইতে মুসলেমের নিস্পদন ধমনী ।
গাবো সে দুর্দম বীর্য দীপ্ত উন্মাদনা,
কৃপা করি অগ্নিময়ী করো এ রসনা ।”
পৃথিবীতে মুসলমানদের উন্নতির জন্যে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আশীর্বাদ হিসেবে যুগে যুগে যে সকল মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিলেন আল ফারাবী তাঁদের অন্যতম । তাঁর জন্ম তারিখ কত তা সঠিকভাবে জানা যায় না । তাঁর তারিখের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে । এর অন্যতম কারণ হল তৎকালীন যুগে কারো জন্ম তারিখ লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে তেমন কোন গুরুত্ব ছিল না । যতদূর জানা যায় এ মনীষী ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিস্তানের অর্ন্তগত ‘ফারাব’ নামক শহরের নিকটবর্তী ‘আল ওয়াসিজ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । ‘ফারাব’ নামক শহরের নামানুসারে আবু নাসের মোহাম্মদ পরবর্তীতে ‘আল ফারাবী’ নামে পরিচিত হন । বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায়, অনেকেই তাঁদের জন্মস্থান, নিকটবর্তী শহর কিংবা দেশের নামে পরিচিত ছিলেন । আল ফারাবীর ক্ষেত্রেও তার বিপরীত ঘটে নি । ইউরোপীয় পন্ডিতগণ তাঁর নামকে বিকৃত করে ফারাবিয়াস লিপিবদ্ধ করেছে । আল ফারাবীর পিতা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং সেনাবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা । তাঁর পূর্ব পুরুষগণ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী । ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও রাজনৈতিক কারণে তাঁর পূর্ব পুরুষগণ পারস্য ত্যাগ করে তুর্কিস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ।

আল ফারাবী বাল্যকাল থেকেই ছিলেন জ্ঞান পিপাসু । অজানাকে জানার এবং অজেয়কে জয় করার প্রবল আকাঙ্খা ছিল তাঁর হৃদয়ে । তাই জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনায় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর সারাটা জীবন । জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ছুটে চলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে । তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় ফারাবায় । সেখানে কয়েক বছর শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে যান বোখারায় । এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্যে তিনি গমন করেন বাগদাদে । সেখানে তিনি সুদীর্ঘ প্রয় ৪০ বছর অধ্যয়ন ও গবেষণা করেন । কয়েকটি ভাষার উপর ছিল তাঁর পূর্ণ দখল । জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ছিলেন তিনি পারদর্শী । দার্শনিক এবং বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা বাকি ছিল না, যেখানে ফারাবীর প্রতিভা বিস্তৃত হয় নি । কিন্তু তারপরও জ্ঞানের পিপাসা তাঁর মিটে নি । জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি ছুটে গিয়েছেন দামেস্কে, মিসরে এবং দেশ বিদেশের আরো বহু স্থানে । গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও প্রশাখা নিয়ে । পদার্থ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, ‍যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতিতে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য । তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর অবদান ছিল সর্বাধিক । পদার্থ বিজ্ঞানে তিনিই ‘শূণ্যতার’ অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন । দার্শনিক হিসেবে ছিলেন ‘নিয়প্লেটনিস্ট’দের পর্যায় বিবেচিত । বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক হিসেবে তিনি আরোহণ করেছিলেন জ্ঞানের শীর্ষে ।

একবার রাজা সাইফ আদ দৌলার শাহী দরবারে মনীষী আল ফারাবী উপস্থিত হন । ইতিপূর্বে রাজা বিজ্ঞানী আল ফারাবীর নাম শুনেছিলেন কিন্তু ফারাবীর সাক্ষাৎ পাননি । ফারাবীকে নিকটে পেয়ে রাজা খুব খুশি হন এবং ফারাবীর সাথে জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন । আলোচনায় ফারাবীর জ্ঞান ও গুণাবলীতে রাজা মুগ্ধ হন এবং তাঁকে খুব সম্মান দেখান । বিজ্ঞানী আল ফারাবী রাজার সংঙ্গী হিসেবে এখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন ।

বিজ্ঞানী আল ফারাবী সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে বহু রচনা করেছেন । কিন্তু তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন । এ সকল অমূল্য গ্রন্থের অধিকাংশেরই সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না । তাঁর রচিত ‘আলা আহলে আল মদীনা আল ফাদিলা (দর্শন ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান সম্পর্কিত ) গ্রন্থটি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য । সমাজ বিজ্ঞান সম্পর্কে ও তার রচিত কয়েকটি গ্রন্থ তাঁকে বিখ্যাত করেছে । তিনি আজ পৃথিবীতে বেঁচে নেই । কিন্তু মুসলিম জাতির কল্যাণে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের যে মৌলিত আবিষ্কার রেখে গেছেন তা চর্চা করলে মুসলমানরা আজও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করতে পারবে । তিনি কত সালে ইন্তেকাল করেন তা নিয়ে মতভেদ আছে । যতদূর জানা যায় তিনি ৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছিলেন ।

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − six =