নীড় / মনীষীর জীবনী / ৮৬. ডেভিড লিভিংস্টোন

৮৬. ডেভিড লিভিংস্টোন

৮৬. ডেভিড লিভিংস্টোন

[১৮১৩-১৮৭৩]

প্রায় দেড়শো বছর আগেকার কথা। তখন আফ্রিকা মহাদেশকে বলা হত অন্ধকার মহাদেশ। উত্তরে মিশরকে বাদ দিয়ে আফ্রিকার অবশিষ্ট সমস্ত অঞ্চল জুড়েই ছিল গভীর অরণ্য । মানুষেরা ছিল আদিম অসভ্য বর্বর। শিক্ষার কোন আলোই সেখানে পৌছায়নি। সভ্য মানুষেরা যেখানে যেত শিকারের লোভে আর দেশ জয়ের আকাঙ্ক্ষায়। ডেভিট লিভিংস্টোন প্রথম মানুষ যিনি অন্ধকারে মহাদেশে গেলেন, মনে অদম্য সাহস, উৎসাহ , ভালবাসা আর আত্ম-উৎসর্গের অনুপ্রেরণা। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার আলোকে তুলে ধরেছিলেন আফ্রিকার মানুষের কাছে।

ডেভিড লিভিংস্টোনের জন্ম ১৮১৩ সালের ১৯শে মার্চ গ্লাসগোর কাছে ব্লানটায়ারে। তাঁর পিতা নীল লিভিংস্টোন ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। খুচরো চায়ের কারবারের সাথে মিশনারীর কাজ করতেন। প্রায়শই ধর্মীয় কাজে এত বেশি জড়িত হয়ে পড়তেন, ব্যবসায়ের ক্ষতি হত। কখনো তার জন্যে সামান্যতম দুঃখিত হতেন না নীল লিভিংস্টোন। মনে করতেন তিনি যা কিছু করেন ঈশ্বরের অভিপ্রেত অনুসারেই করেন।

নিজের এই ঈশ্বর বিশ্বাস পুত্রের মধ্যে অনুপ্রাণিত করেছিলেন পিতা। তিনি চাইতেন লিভিংস্টোন যেন কোন বিজ্ঞানের বই না পড়ে। ধর্মীয় সাধনায় পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করে। লিভিংস্টোন সমস্ত জীবন ধরে ছিলেন ঈশ্বর বিশ্বাসী কিন্তু কোন ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি লিখেছিলেন কোন কোন ব্যাপারে আমি পিতার সঙ্গে কিছুতেই একমত হতে পারতাম না। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে কোনদিনই আমি ধর্মের শুকনো নিয়মের মধ্যে নিজেকে বাঁধতে পারিনি।

সংসারের অভার-অনটনের জন্য দশ বছর বয়েসে ডেভিডকে সুতো কারখানায় কাজ নিতে হল। সেই শিশু বয়সেই তাঁকে প্রতিদিন চোদ্দ ঘণ্টা করে কাজ করতে হত। এত পরিশ্রম করেও তাঁর মধ্যে ছিল পড়াশুনা করবার প্রবল আগ্রহ। কাজের ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন তখনই নানান বিষয়ের ঠাট্টা করত। কিন্তু শিশুকাল থেকেই এমন গভীর আত্মবিশ্বাস ছিল যে সামান্য তম বিচলিত হতেন না লিভিংস্টোন।

বই পড়তে পড়তে মনের মধ্যে জেগে উঠত নানান কল্পনা। সবচেয়ে ভাল লাগত ভ্রমণ কাহিনী। তাঁর মন ভেসে চলত অজানা দেশে। ভাবতেন তিনিও যাবেন ঐ সমস্ত দেশে। একদিন এক জার্মান মিশনারীর লেখা একটি বই তাঁর হাতে এল। বইখানি পড়তে পড়তে মিশনারী জীবনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। কিন্তু পিতার ধর্মীয় উন্মাদনাকে কোনদিনই শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারেননি লিভিংস্টোন। তাঁর মনের মধ্যে জেগে ওঠে এক গভীর সংশয় আর দ্বন্দ্ব। টমাস ডিকের লেখা একটি বই পড়ে তাঁর মনের মধ্যে এক নতুন চেতনার উন্মেষ হল। “ধর্ম এবং বিজ্ঞান কেউ পরস্পরের বিরোধী নয়। উভয়ের পরিপূরক। বিজ্ঞান চেতনা নিয়ে যদি ধর্মের সাধনা করা যায় তবে সেখানে কোন গোঁড়ামি, ধর্মীয় উন্মাদনা প্রবল হয়ে উঠতে পারে না।”তখনই তিনি মিশনারী জীবনকে গ্রহণ করবার জন্য মনস্থির করলেন।

মিশনারী সোসাইটি থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি তাঁর জবাবে বললেন, “আমি নিজেকে কখনো ঈশ্বরের দাস ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করিনি। তাঁরই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে আমি চালিত হয়েছি। মিশনারী হিসাবে আমি যে দায়িত্ব পালন করেছি তা বাইবেল হাতে ধর্মান্ধ প্রচারকদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। তবে আমি শুধু ধর্মের প্রচারের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিনি। তারই সাথে সাথে মানুষের চিকিৎসা করেছি, রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি, ছুতোরের কাজ করেছি। আমি মনে করি যখন আমি আমার সঙ্গীদের খাবার জন্য শকার করি, যখন আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করি, মানুষের জন্য কোন কাজ করি, সবই প্রভূ যীশুর সেবা।”

তিনি ফিরে এলেন আফ্রিকায়। শুরু হল নতুন করে জাম্বেসি অভিযান। এইবার লিভিংস্টোনের সঙ্গী হলেন তাঁর ভাই জন। কিন্তু নানান অসুবিধার জন্য মাঝপথেই এই অভিযান পরিত্যাক্ত হল। অকস্মাৎ লিভিংস্টোনে জীবনে নেমে এল এক বিচ্ছেদ বেদনা্। তাঁর প্রিয়তমা পত্নীর মৃত্যু হল। লিভিংস্টোন লিখেছেন, “যখন আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম তখন থেকেই তাকে ভালবাসি, যতদিন বাঁচব তাকে ভালবেসে যাব।

স্ত্রীর এই বিচ্ছেদ বেদনায় সাময়িক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন লিভিংস্টোন। সময়ের ব্যবধানে মনের শোক প্রশমিত হতেই নতুন অভিযানে বার হলেন। এইবার আবিস্কার করলেন নিয়ামা হ্রদ। তার দশ দিনের মধ্যে উপস্থিত হলেন বাঙ্গোয়েল হ্রদের তীরে। এই হ্রদটিও অজানা ছিল ইউরোপীয়ানদের কাছে। নিয়ামা হ্রদের তীরে এসে সমুদ্রে ভাসার মত ছোট একটি ডিঙি তৈরি করলেন। এই ‍ডিঙি বেয়েই আফ্রিকার সমুদ্র উপকূল থেকে ২৫০০ মাইল উত্তাল সমুদ্র পার হয়ে লিভিংস্টোন এসে পৌছালেন ভারতবর্ষের বোম্বে শহরে। ভারতবর্ষ তখন ইংরেজ উপনিবেশ। ভারত ভ্রমণের ইচ্ছা ছিল লিভিংস্টোনের। কিন্তু তখন লন্ডন অভিমুখী একখানি জাহাজ যাত্রার জন্যে অপেক্ষা করছিল। লিভিংস্টোন আর অপেক্ষা করলেন না। সেই জাহাজের আরোহী হলেন। ১ লা জুলাই ১৮৬৪ সালে তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখলেন । ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে তিনি তাঁর জাম্বেসি অভিযানের কাহিনী নিয়ে একখানি বই লিখলেন। এই বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে তিনি আবার ফিরে চললেন আফ্রিকায়। ইংল্যান্ড তাঁর জন্মভূমি হলেও আফ্রিকা ছিল তাঁর কর্মভূমি। ইংল্যান্ডের সুখ বিলাসের মধ্যে থেকে প্রতিমুহূর্তে  তিনি অন্তরে অনুভব করতেন আফ্রিকার আদিম অরণ্যের আহ্বান। এইবার আফ্রিকা যাত্রার সময় তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নীল নদের উৎস আবিস্কার করবেন। আফ্রিকায় থাকার সময় তিনি দেখেছিলেন নিগ্রোদের নিয়ে ইউরোপীয়ানদের দাস ব্যবসা শুরু হয়েছে। এই ঘৃণিত ব্যবসা দেখে মনে মনে ব্যথিত হতে লিভিংস্টোন। মনে হয়েছিল মানবিতার বিরুদ্ধে এই ঘৃণিত অপরাধকে যেমন করেই হোক তাঁকে বন্ধ করতেই হবে।
আফ্রিকায় ফিরে কিছু সঙ্গী-সাথী, একদল সিপাই নিয়ে যাত্রা করলেন। দলের অধিকাংশই ছিল অভিযানের পক্ষে অযোগ্য। কিছু লোক মাঝপথে দল   ত্যাগ করল। তারা ফিরে গিয়ে চারদিকে প্রচার করে দিল লিভিংস্টোনকে হত্যা করা হয়েছে। সাথে সাথে অনুসন্ধানী দল পাঠানো হল। অনেক অনুসন্ধানের পর এই সংবাদ মিথ্যা প্রমাণিত হল।

এইবার লিভিংস্টোন উত্তরের পথে চলতে চলতে গিয়ে পৌছলেন ট্যাঙ্গানিকা হ্রদের তীরে। বিশাল হৃদ। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে তার বিস্তৃত জলরাশি। এখানে গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন লিভিংস্টোন। কিন্তু নিজের দেহের প্রতি সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ নেই ‍লিভিংস্টোনের। ধীর পদক্ষেপে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছেন। কখনো ভিজে পোশার গায়েই শুকিয়ে যাচ্ছে। ঠিক সময়ে খাওয়া হয় না। ক্রমশই শরীরের এমন অবস্থা হল, চলবার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেললেন। একদল আরব সেই পথে যাচ্ছিল। তাদের চিকিৎসা ও সেবাযত্নে পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠলেন লিভিংস্টোন। আবার শুরু হল যাত্রা, লক্ষ্য নীল নদের উৎসস্থল। কিন্তু শরীরে আর আগের শক্তি ছিল না, তার উপর ক্রমাগত জ্বর আর আমাশয় ভুগছিলেন। সঙ্গীদের মধ্যে অধিকাংশই হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহী। একটি নিগ্রো ছেলে তাঁর সমস্ত ঔষুধ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গের জিনিসপত্রও ফুরিয়ে এসেছিল। চলবার শক্তি হারিয়ে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় অযাচিতভাবেই ঈশ্বরের আশীবাদ এসে গেল।

মিঃ এইচ. এম. স্টেনলি নামে এক ইংরেজ অভিযাত্রীকে লিভিংস্টোনের সন্ধানে পাঠানো হয়েছিল। একদিন মিঃ স্টেনলি দেখলেন একদল আরবের সাথে এক শীর্ণকায় শ্বেতাঙ্গ। সারা মুখে বড় বড় দাড়ি, মাথায় টুপি। মিঃ স্টেনলি এগিয়ে ‍গিয়ে হাত ধরলেন-আপনিই কি ডঃ লিভিংস্টোন? মুহূর্তে লিভিংস্টোনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে হল অন্ধকারে যেন আলোর দিশা খুঁজে পেলেন। কয়েকদিন পর নতুন উদ্যমে দুজন টাঙ্গানির উত্তর তীর ধরে এগিয়ে চললেন, এখান থেকে মিঃ স্টেনলি বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে লিভিংস্টোনের প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র, নতুন কুলি যোগাড় করে দিয়ে গেলেন।

কিন্তু ‍লিভিংস্টোনের জীবনিশক্তি শেষ হয়ে ‍এসেছিল, কিন্তু তাঁর অদম্য মনোবল এতটুকু ফাটল ধরেনি। কোনক্রমে এগিয়ে চলেছেন আর প্রতিদিনকার বিবরণী খাতায় লিখে রাখলেন। দিনটা ছিল ১৮৭৩ সালের ২৭শে এপ্রিল। শেষ ডাইরি লিখলেন লিভিংস্টোন। তারপর আচ্ছন্নের মত বিছানায় লুটিয়ে পড়লেন। দুটো দিন কেটে গেল, ১ লা মে ভোরবেলায় একটি নিগ্রো চাকর এসে তিনি বিছানার পাশে প্রার্থনারত অবস্থাতেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন।

তাঁর প্রিয় চাকরটি বহুকষ্টে লিভিংস্টোনের মৃতদেহ, তাঁর জিনিসপত্র সবকিছু নিয়ে এল জনজিবারে সাগরের উপকূলে। সেখান থেকে সেই মৃতদেহ জাহাজে করে ইংল্যান্ডে ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যবেতে নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করা হল। দেহ ইংল্যান্ডে গেলেও লিভিংস্টোনের আত্মা রয়ে গিয়েছিল তাঁর প্রিয় আফ্রিকায়।

 

সম্বন্ধে ডলি খাতুন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + 18 =