নীড় / মনীষীর জীবনী / ৮২. জর্জ ওয়াশিংটন
জর্জ ওয়াশিংটন

৮২. জর্জ ওয়াশিংটন

৮২. জর্জ ওয়াশিংটন

[১৭৩২-১৭৯৯]

জর্জ ওয়াশিংটনের জন্ম আমেরিকায় ভার্জিনিয়াতে। জন্ম তারিখ ২২.২.১৭৩২। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ইংল্যান্ডের মর্দম্পটন-সায়ারের অধিবাসী। জর্জের বাবা নিজের চেষ্টায় বেশ কিছু বিরাট বিরাট খামার গড়ে তুলেছিলেন। জর্জের বাবা প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর একটি মাত্র ছেলে ছিল। দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সন্তার জর্জ। ছেলেবেলায় বাড়িতেই  পড়াশুনা করতেন জর্জ। আর বাকি সময়ে খামার ঘুরে ঘুরে চাষবাস দেখাশুনা করতেন। যখন তাঁর এগারো বছর বয়স, অপ্রত্যাশিতভাবেই  বাবা মারা গেলেন।

জর্জের বৈমাত্রেয় ভাই লরেন্স শ্বশুরবাড়িতে থাকত। লরেন্সের শ্বশুর লর্ড ফেয়ারফ্যাক্স ছিলেন ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। লরেন্স জর্জকে নিয়ে এলেন নিজের কাছে। তিনিই জর্জের শিক্ষার বন্দোবস্ত করলেন। পাঁচ বছর ফেয়ারফ্যাক্স (Fair Fax) পরিবারেই রয়ে গেলেন জর্জ। এই সময় সেনানডোরা নামে এক উপত্যকায় ষাট লক্ষ একর জমি কিনলেন লর্ড ফেয়ারফ্যাক্স। এই জমির মাপ করবার জন্য একদল সার্ভেয়ারকে সেখানে পাঠানো হল। জর্জ ওয়াশিংটনের বয়স মাত্র ১৭। দু’ বছর প্রধান সার্ভেয়ার হিসাবে কাজ করলেন।

ডার্জিনিয়ার সেনাপতি হিসাবে তিনি মাত্র তিন বছর ছিলেন। তারপর স্বাস্থ্যের কারণে পদত্যাগ করে ফিরে এলেন নিজের জমিদারি মাউন্ট ভার্ননে। এই সময় পরিচয় হল মার্থা ড্রানড্রিজের সাথে। ড্রানড্রিজ ছিলেন বিধবা, বিরাট জমিদারির মালিক। মার্থা আকৃষ্ট হলেন ওয়াশিংটনের ব্যক্তিত্বে বিয়ে হল দুজনের। এই বিবাহিত জীবনে দুজনেই সুখী হয়েছিলেন। এর পরের সতেরো বছর তিনি জামিদারির কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।

১৭৭৪ সালে ফিল্মডেলফিয়া শহরে তেরোটি মার্কিন উপনিবেশের প্রতিনিধিদের প্রথম সম্মেলন বসল। জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁকে ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত করা হল। এই অধিবেশনেই সমস্ত সদস্যদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।

পরের বছর দ্বিতীয় অধিবেশন বসল। এই অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে ওয়াশিংটনকে সমগ্র উপনিবেশের সেনাপ্রধান হিসাবে নিযুক্ত করা হল। ওয়াশিংটন  স্ত্রীকে লিখলেন, “আমার ভাগ্য আমাকে এই পদ দিয়েছে।”

অবশেষে ৭ই জুন ১৭৭৬ তেরোটি প্রদেশের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করল। পাঁচজনের এক পরিচালনা গোষ্ঠী তৈরি হল। এর প্রধান হলেন টমাস জেফারেসন। ৪ঠা জুলাই (4th july) ১৭৭৬ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করা হল। এতে স্বাধীনতা ঐক্যের কথা প্রচারিত হল। দেশের বিভিন্ন প্রদেশে শুরু হয়ে গেল ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে আমেরিকানদের যুদ্ধ। নানান প্রতিকূলতার মধ্যে ওয়াশিংটনকে তাঁর সৈন্যবাহিনী সংগঠিত করতে হয়েছিল। তাঁর সৈন্যদের মধ্যে খুব কমই ছিল নিয়মিত সৈন্য। তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও ছিল না। উন্নত মানের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না।

ওয়াশিংটন জানতেন তাঁর সেনাদলেন সামর্থ্য নিতান্তই কম। তারা অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে যুদ্ধ করে চলেছে। তাই পদমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে তাদের সাথে একাত্ম হয়ে গেলেন। ওয়াশিংটনের সৈনিকরা তাঁকে বলত “দরকারী মানুষ”। অথচ নিজেন জীবনকে তিনি কখনো দরকারী বলে মনে করতেন না। একদিন অন্য সব সামরিক অফিসারদের সাথে খেতে বসেছেন, এমন সময় একটি রেড ইন্ডিয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল। টেবিলের উপর রাখা মাংসের পুরো রোস্টটা তুলে নিয়ে খেতে আরম্ভ করল। তখন খাবারের ভীষণ অভাব। সকলে রেড ইন্ডিয়ানকে শাস্তি দেবার জন্য উঠে দাঁড়িতেই ওয়াশিংটন বাধা দিলেন। তিনি বললেন, ওকে ছেড়ে দাও, দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন ওর কিছু খাওয়া হয়নি।

তাঁর দলেন সৈনিকদের সু্যোগ-সুবিধার দিকে তাঁর ছিল তীক্ষ্ম নজর। একদিন  কোন একটি ক্যাম্পে একজন সৈনিক ঠান্ডা লেগে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সমস্ত রাত ধরে কাশছিল। শেষ রাতে হঠাৎ দেখতে পেল কেউ তার  তাঁবুতে ঢুকছে। কাছে আসতেই চমকে উঠল, স্বয়ং ওয়াশিংটন তাঁর কষ্ট দেখে চা নিয়ে এসেছেন। প্রথম দিকে ইংরেজ বাহিনী সাফল্যলাভ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। দীর্ঘ পাঁচ বছর মরণপণ সংগ্রামের পর অবশেষে ইংরেজ সেনাপতি কর্ণওয়ালিশ ১৭৮১ সালে আত্মসমপর্ণ করলেন। যুদ্ধে জয়ী হল আমেরিকানরা। এই যুদ্ধ জয়ের পেছনে ওয়াশিংটনের ভূমিকার ছিল সবচেয়ে বেশি। তাঁর ইচ্ছাশক্তি, সৈনিকদের প্রতি ভালবাসা এবং শৃঙ্খলানোধ এই যুদ্ধে তাঁকে বিজয়ী নায়কের গৌরব ‍দিয়েছিল।

আমেরিকায় স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক হয়েও তার কোন উচ্চাশা ছিলনা । তিনি নিজের কর্তব্য শেষ করে প্রধার সেনাপতির পদ ত্যাগ করলেন। ফিরে এলেন নিজের জমিদারিতে।

কিন্তু আমেরিকার মানুষ চাইছিল তাঁ অসামান্য কর্মকুশলতাকে কাজে লাগাতে। ১৭৮৭ সালে দেশের সংবিধান তৈরি করার জন্য সমস্ত প্রদেশের প্রতিনিধিরা সম্মিলিত হলেন। ওয়াশিংটনও সেখানে যোগ দিলেন। নতুন সংবিধানের রূপরেখা বর্ণনা করে সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে জর্জ ওয়াশিংটনকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করলেন। তিনি হলেন আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রথমেই তিনি দেশ ও সমস্ত জাতিকে শান্তিপূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বার জানালেন।

তিনি জানতেন দেশের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মত ও বিরোধী পক্ষ। সকলে সাহায্য ছাড়া এই শিশু রাষ্ট্রকে কখনোই গড়ে তোলা সম্ভবপর নয়। তাই তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় দুটি বিরোধী পক্ষকে একত্রিত করবার চেষ্টা করলেন। আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ছিলেন রক্ষণশীল দলের প্রধান এবং ধনতন্ত্রের জোরালো সমর্থক। তাঁকে স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্ব দিলেন।

ওয়াশিংটন জানতেন দেশের সামনে এখন সমস্যা।একমাত্র যোগ্যতম ব্যক্তিরাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তাই সমস্ত দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জেফারসান ও হ্যামিলটনকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন।  তাঁর এই সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। হ্যামিলটন ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি, দার্শনিক, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ। তিনি নানান কর বসিয়ে ইউনিয়ন সরকারের আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে ঋণ হয়েছিল। সেই ঋণভার রাজ্য সরকারের হাত থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দিলেন। জাতীয় ব্যাঙ্ক স্থাপন করা হল। অভ্যন্তরীণ উন্নতির সাথে সাথে বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলবার দিকে নজর দিলেন ওয়াশিংটন। এমনকি ব্রিটেনের সাথেও তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন নতুন কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

১৭৯৩ সালে যখন ফরাসী বিপ্লব শুরু হল, তিনি বিপ্লবীদের সমর্থন করলেও নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করলেন। এর ফলে আমেরিকা প্রতিটি বিদ্যমান দেশেই বাণিজ্য করবার সুযোগ পেল। দেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে অসাধারণ যোগ্যতা প্রদশনের জন্য ১৭৯২ সালে তাঁকে দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হল।

দ্বিতীয় বারে নির্বাচন কাল শেষ হল। তাঁকে সকলেই অনুরোধ জানালে তৃতীয় বারের জন্য নির্বাচিত হতে। তিনি সবিনয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমি কর্মক্ষম স্বাস্থ্যবান রয়েছি…শুধুমাত্র সেই কারণেই আমি এই পদ চাই-না এটা শুধু অযৌক্তিক নয়, অপরাধ হবে যদি আমি পদ আঁকড়ে থাকি। হয়ত অপর কেউ আমার চেয়েও আরো ভালভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে।” ‍তিনি ইংল্যান্ডের ক্রমওয়েলের মতই এক নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু ক্রমওয়েলের মত তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। তাঁকে যে মহান দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল। তিনি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন। তার পর সেই দায়িত্ব অন্যের উপর তুলে দিয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলেন।

সম্বন্ধে ডলি খাতুন

এছাড়াও পড়ুন

৯৭. সত্যজিৎ রায়

৯৭. সত্যজিৎ রায় [১৯২১-১৯৯২] বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্র পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − nine =