নীড় / ভ্রমণ / ভাবনার বুকে এক টুকরো কাশ্মীর
Kashmir

ভাবনার বুকে এক টুকরো কাশ্মীর

রাতে তাঁবুর বাইরে পোর্টেবল স্পিকারের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কব্জির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে বাজে। দেরি হয়ে গিয়েছে তো! স্লিপিং ব্যাগের চেন খুলে ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছিলাম। হাতে আর এক ঘণ্টা। তার মধ্যেই জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। তা না হলে সকাল ৯টা-১০টার মধ্যে পার হওয়া যাবে না পিন-ভাবা পাস।

(পর্ব ১)

ট্রেকিংয়ের নেশাটা বেশি দিনের নয়। কিন্তু প্রথম বার ট্রেকিংয়ে গিয়েই বুঝেছিলাম, এ অন্য ভাললাগা। সেই মতো ইন্টারনেট ঘেঁটে এ বার হিমাচলপ্রদেশের হাই অল্টিটিউড পিন-ভাবা পাসকে বেছেছিলাম। এই ট্রেকিংয়ে ভাবা উপত্যকা দিয়ে পাস পেরিয়ে পিন এবং স্পিতি উপত্যকায় যাওয়া যায়। ভাবা উপত্যকায় রয়েছে জঙ্গল, নদী— সবুজের প্রাচুর্য। আর পিন এবং স্পিতি রুক্ষ উপত্যকা। তেমন সবুজ নেই। একটি ট্রেকিং সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেপ্টেম্বরের এক সকালে কলকাতা ছেড়েছিলাম।

এ বার মোট আট দিনের ট্রেকিং। এর মধ্যে ছ’দিন হাঁটা। দু’দিনের গাড়ি-সফর। ঠিক ছিল, সিমলায় দলের অন্যদের সঙ্গে দেখা হবে। সেখান থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের কাফনু গ্রাম থেকে শুরু হবে ভাবা উপত্যকায় হাঁটা। আমরা মোট ১৬ জন ট্রেকার আর তিন জন গাইড ছিলাম। সকালে সিমলা থেকে বেরিয়ে সন্ধেয় পৌঁছেছিলাম কাফনুর হোটেলে।

(পর্ব ২)

কাফনু ছোট্ট গ্রাম। এখানেই রয়েছে ভারতের প্রথম ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ড্যাম’ ভাবা হাইড্রো প্রজেক্ট। ওই বাঁধের পাশ দিয়ে হেঁটে আমরা প্রথম ক্যাম্প সাইট মুলিংয়ের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। প্রথম দিন প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার হেঁটেছিলাম। পৌঁছতে হয়েছিল ৭,৮৭৮ ফুট থেকে ১০,৬৩৭ ফুট উচ্চতায়। কাফনু থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে শুরু হয়েছিল ঘন জঙ্গল। ওক, পাইন, বার্চের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পেরোলাম ভাবা নদী। কিছুক্ষণ পরেই শুরু বৃষ্টি। সমতলের বৃষ্টি ভালই লাগে। কিন্তু পাহাড়ি জঙ্গলে কাদা মাড়িয়ে ভিজতে ভিজতে হাঁটা মোটেই সুখকর ছিল না। তার উপরে ট্রেকিং লিডার জুড আবার ‘ভয়’ দেখাচ্ছিল— ‘‘তাড়াতাড়ি জঙ্গল পেরোতে হবে। এখানে কিন্তু ভালুক রয়েছে!’’

সাত-আট ঘণ্টা হেঁটে বিকেলে পৌঁছেছিলাম প্রথম ক্যাম্প সাইটে। ভাবা নদীর একটি শাখা নদীর পাশে তাঁবু খাটানো হয়। সেখানে পৌঁছে অন্য বিপত্তি। এক ট্রেকারের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল। ট্রেকিংয়ের শুরুতেই এই অবস্থা হলে উনি যাবেন কী ভাবে! ঠিক হল, জুড পরের দিন ওই ট্রেকারকে নিয়ে কাফনুতে নেমে যাবে। আর আমরা হাঁটা লাগাব পরের ক্যাম্প সাইট কারার দিকে।

(পর্ব ৩)

স্পিতি-উপত্যকা
                                                 স্পিতি-উপত্যকা

পরের দিনের হাঁটা ছিল ছ’কিলোমিটার। মুলিং থেকে এক হাজার ফুট মতো উঠলেই পৌঁছব কারায়। যত উপরে উঠি আর পিছন ফিরে তাকাই, ততই মুগ্ধ হতে হয়— এত সবুজও হতে পারে কোনও জায়গা! এ যেন এক টুকরো কাশ্মীর। দুপুরে দূর থেকে কারা ক্যাম্প সাইট দেখা যাচ্ছিল। সবুজ গালিচায় মোড়া উপত্যকায় তখন মেঘ আর আলোছায়ার খেলা। আর সেখানে ঘুরছে বুনো ঘোড়া।

কারায় পৌঁছে তাঁবু খাটিয়ে প্রথম কাজ ছিল ঘাসের গালিচায় সটান শুয়ে পড়া। ওই ঠান্ডার মধ্যে রোদ পোয়ানো সৈকতের সান বাথের চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। কারার পাশেই বয়ে গিয়েছে নাম না জানা একটা নদী। উপত্যকার সৌন্দর্য দেখে আর আড্ডা দিয়েই কেটে গিয়েছিল বাকি দিনটা।

(পর্ব ৪)

কারা থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল ফুতসিরং। কারার পাশে থাকা নদীটা জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। একই নদী আমাদের প্রায় তিন জায়গায় পেরোতে হয়েছিল। ঠান্ডা জলে হাঁটু ডুবিয়ে নদী পার হওয়া যে কী কষ্টের, তা আগের ট্রেকিংয়েই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তাই এ বার জলে নেমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী পার হয়েছিলাম। তার পর পাড়ে বসে আমাদের কাজ ছিল, পায়ের পেশি হাত দিয়ে ঘষে গরম করা।

এ দিন আমাদের যেতে হতো পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু চড়াইটা বেশি ছিল। বেঙ্গালুরুর কিষণ হাঁটছিল সবার আগে। ওর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়েই পড়লাম বেকায়দায়। খেয়াল করলাম, কানে তালা লেগেছে, মাথা ঝিমঝিম করছে, অল্প ঝিমুনিও আসছে। দলের এক সদস্যকে কথাটা বলতেই তিনি দিলেন বকুনি। বললেন, ‘‘প্রায় সাড়ে তেরো হাজার ফুট উঁচুতে রয়েছ। এত জোরে হাঁটার কী আছে? ধীরে হাঁটো। না হলে হাই অল্টিটিউড সিকনেস হতে পারে।’’ ভয় পেয়েছিলাম। হাই অল্টিটিউড সিকনেস রোখার ওষুধ আমি খাইনি। শরীর খারাপ হলে বিপদ। তাই ধীরে ধীরে হেঁটে দুপুরের একটু পরে ১৩ হাজার ৪৭৪ ফুট উচ্চতায় ফুতসিরং ক্যাম্পসাইটে পৌঁছলাম। সেখানে তাঁবু খাটানোর আগেই অল্প বরফ পড়তে শুরু করল। কোনও রকমে তাঁবু খাটিয়ে সোজা তার ভিতরে। গিয়ে দিব্য এক ঘুম।

(পর্ব ৫)

Kashmir Valley
                                                কাশ্মীর ভ্যালী

অ্যাক্লিমেটাইজ়েশন ডে ছিল পরের দিনটা। ফুতসিরং থেকে ভাবা পাস আরও ২,৬০০ ফুট উঁচুতে। ১৬ হাজার ১০৫ ফুট উঁচুতে থাকা ওই পাস পেরিয়ে আমাদের যেতে হবে মনগ্রুংসে ক্যাম্প সাইটে। শরীরকে এই উচ্চতায় খাপ খাওয়াতে পরের দিনটা ফুতসিরংয়েই ছিলাম। ওই দিনেই কাফনু থেকে ফুতসিরংয়ে ফিরে এসেছিল জুড। এ দিকে, আবহাওয়া খারাপ হচ্ছিল। তাতেই জুড জানিয়েছিল, রাত তিনটেয় উঠে চারটের মধ্যে হাঁটা শুরু করব আমরা। রাস্তায় আবহাওয়া খারাপ হলে ফুতসিরংয়ে ফিরে আসব।

(পর্ব ৬)

পরের দিন ভোর তিনটের দিকে জুডের চালানো পোর্টেবল স্পিকারের আওয়াজে ঘুম ভেঙেছিল। চারটের আগেই হেড ল্যাম্প জ্বেলে ফুতসিরং থেকে হাঁটা শুরু করেছিলাম। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। একে অন্যের পিছনে পিছনে হাঁটছি। পাহাড়ের ঢালও প্রায় ৮০ ডিগ্রির মতো। সঙ্গে বড় পাথর আর বোল্ডার। আগে যে ক’দিন হেঁটেছি, তার থেকে একেবারেই অন্য রকম ভাবা পাসে যাওয়ার পথ। ভাবা পাসে পৌঁছনোর কয়েকশো ফুট আগে থেকেই বরফ পেয়েছিলাম আমরা। ন’টার দিকে পৌঁছেছিলাম পাসে। বরফ ছিল। সঙ্গে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া।

পাস থেকে এ বার উল্টো দিকে পিন এবং স্পিতি উপত্যকায় নামার পালা। রুক্ষ উপত্যকার বুক চিরে বয়ে গিয়েছে পিন নদী। নদী পেরিয়ে হাঁটছিলাম মনগ্রুংসের উদ্দেশে। দুপুরের পরে শুরু হল ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এ দিন প্রায় ১১ কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছিল আমাদের। ১৬,১০৫ ফুট উঁচুতে থাকা ভাবা পাস পেরিয়ে নেমেছিলাম ১৩,৬৭৪ ফুট উচ্চতায়। শরীর আর টানছিল না। প্রায় ১২ ঘণ্টা হেঁটে বিকেল চারটের পরে পৌঁছেছিলাম মনগ্রুংসে ক্যাম্পে।

(পর্ব ৭)

শেষ দিনের হাঁটা ছিল মুধ গ্রামের উদ্দেশে। ওই দিন ঘুম থেকে উঠে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, তাদের মাথায় বরফের টুপি। আগের দিন যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছিলাম, সেই রাস্তায় বরফের আস্তরণ। মনগ্রুংসে থেকে মুধের দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। পিনের একটি শাখানদীকে বাঁ দিকে রেখে আমাদের ফের শুরু হয় হাঁটা। প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে গিয়ে দেখি, পাহাড়ের একটা অংশে ধস নেমেছে। সেই অংশ হেঁটে পার হওয়াটা অন্য রোমাঞ্চ। পথে এক জায়গায় দেখি ছোট্ট একটা তাঁবু। পশুপালকেরা যে রকম তাঁবু ব্যবহার করেন, এ তার চেয়ে আলাদা। হাঁক দিলাম— কে ওখানে? তা শুনে তাঁবু থেকে মুখ বার করেছিলেন এক বিদেশি পর্যটক। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, কম্পাসের উপরে ভরসা করে তিনি একাই চলেছেন ভাবা পাস পেরোতে। তবে কাফনুর দিক থেকে নয়, মুধের দিক থেকে।

পিন-স্পিতি উপত্যকায় হাঁটতে হাঁটতে বহু দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল মুধ গ্রাম। কিন্তু যতই হাঁটি, গ্রামে আর পৌঁছই না! শেষে পিন নদী পেরিয়ে সওয়া তিনটে নাগাদ পৌঁছলাম মুধে। গ্রামে ঢোকার মুখে কিছু বাচ্চা এসে চকলেটের জন্য হাত পেতেছিল। লজেন্স দিতেই কী খুশি ওরা!

(পর্ব ৮)

মুধে সে দিন বেশিক্ষণ থাকা হয়নি। বিকেলেই গ্রামটাকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে আমরা নেমে এসেছিলাম কাজাতে। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম ঝুড়ি ঝুড়ি অভিজ্ঞতা।

 

সম্বন্ধে Avishek Singha Roy

এছাড়াও পড়ুন

travel

সম্পদ নয়, ভ্রমণই দেয় প্রকৃত সুখ!

ঘোরাঘুরি বা ভ্রমন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও কার না ভালো লাগে একটু ঘুরে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 4 =