নীড় / মনীষীর জীবনী / ৫৫. কনফুসিয়াস
কনফুসিয়াস

৫৫. কনফুসিয়াস

৫৫. কনফুসিয়াস
[ খ্রিঃ পূর্ব ৫৫১ – ৪৭৯]

আড়াই হাজার বছর আগেকার কথা । চীনদেশের লু রাজ্যে বাস করতেন ল শিয়াং নামে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতি । মনে শান্তি ছিল না লু শিয়াং –এর । কারণ তিনি নয়টি কন্যার পিতা হলেও একটিও পুত্র সন্তান নেই তাঁর । একদিন গ্রামের পত দিয়ে যেতে যেতে তাঁর ভীষণ তেষ্টা পেয়েছিল । পথের পাশেই ছিল এক গরীব চাষীর কুটির । সেখানে গিয়ে পানি চাইতেই একটি কিশোর মেয়ে এসে পানি দিল । মেয়েটির নাম চেং সাই । তাকে দেখে লু শিয়াং –এর মনে হল মেয়েটি সর্ব সুলক্ষণা । এর গর্ভে নিশ্চয়ই তাঁর পুত্র সন্তান জন্মাবে । চাষীকে তাঁর মনের কথা জানায় ।
লু শিয়াং – এর ইচ্ছায় চাষী এবং তার কন্যা সম্মতি দিল । সেই রাত্রিতেই মিলিত হলেন তাঁরা । কিন্তু তাঁদের এই মিলনের কথা সকলের কাছে গোপন রেখে দিলেন লু শিয়াং ।
অবশেষে চেং সাই একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল । কিন্তু দুর্ভাগ্য লু শিয়াং-এর । পুত্র সন্তান জন্মের সংবাদ অন্য স্ত্রীদের কানে যেতেই তারা লু শিয়াংকে পাগল বলে ঘরে আটকে রাখল । কয়েক মাস পরেই তাঁর মৃত্যু হল ।
ওদিকে চেং সাই – এর কাছেই বড় হয়ে উঠতে লাগল নবজাত শিশুসন্তান । এই শিশুসন্তানই ভবিষ্যতে কনফুসিয়াস নামে সমস্ত জগতে পরিচিত হন ।
লু শিয়াং তাঁর প্রতিশ্রুতি মত কোন অর্থই দিয়ে যেতে পারেন নি চেং সাইকে । কিন্তু তার জন্যে নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করলেন না চেং সাই ।
চরম অভাব অনটনের মধ্যেও চেং সাই স্বামীর প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল । মনে মনে স্বামীর বংশমর্যাদা তাঁর খ্যাতি বীরত্বের জন্য গর্ববোধ করতেন ।
স্কুলে যাবার বয়েস হতেই চেং কনফুসিয়াসকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন ।
অল্পকিছুদিনের মধ্যে শিক্ষক ছাত্র সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন কনফুসিয়াস । একদিকে যেমন তাঁর ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রবল ইচ্ছা, অন্যদিকে অসাধারণ মেধা । শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পড়ে তাঁর মন ভরত না । ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ ।
মায়ের স্নেহে অভাব অনটনের মধ্যেই দিন কাটছিল কনফুসিয়াসের । কনফুসিয়াসের তখন ১৫ বছর বয়স । হঠাৎ তাঁর মা মারা গেলেন । কনফুসিয়াসের জীবনে মাই ছিলেন সব । তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে কনফুসিয়াস বিরাট আঘাত পেলেন ।
কিন্তু সেই কিশোর বয়েসেই নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, এত বড় বিয়োগ বেদনাতেও ভেঙে পড়লেন না । আন্তরিক প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রাখলেন ।

 

তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল স্ত্রীকে স্বামীর পাশেই কবর দেওয়া হবে । পিতার সমাধির পাশে মায়ের দেহ সমাহিত করলেন কনফুসিয়াস । নিজের গৃহে ফিরে এসে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হতেই পরিচিত জনেরা সকলে তাঁকে পরামর্শ দিল পিতার সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে ।

কিন্তু কনফুসিয়াসের আত্মমর্যাদাবোধ এতখানি প্রবল ছিল, তিনি বললেন, যে সম্পত্তি পিতা আমাকে দিয়ে যেতে পারেন নি তাতে আমার কোন লাভ নেই ।

পরবর্তীকালে কনফুসিয়াস বলতেন, আত্মমর্যাদা না থাকলে কোন মানুষই অন্যের কাছে মর্যাদা পেতে পারে না। যে মানুষের মধ্যে এই আত্মসম্মানবোধ আছে একমাত্র সেই হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী ।

মায়ের মৃত্যুতে সাময়িক অসুবিধার মধ্যে পড়লেও নিজের বিদ্যাশিক্ষা অধ্যয়ন বন্ধ করলেন না কনফুসিয়াস । অল্প দিনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান, পান্ডিত্যের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ।

কনফুসিয়াস থাকতেন লু প্রদেশ । এই প্রদেশের অন্যতম প্রধান শাসক ছিলেন চি চি-র কানেও গিয়ে পৌঁছেছিল কনফুসিয়াসের পান্ডিত্যের খ্যাতি । প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলেন চি । কনফুসিয়াসের দারিদ্র্যের কথা শুনে তাঁকে হিসাব রাখবার কাজ দেওয়া হল অল্পদিনেই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন কনফুসিয়াস । চি খুশি হয়ে তাঁকে আরা উঁচু পদ দিলেন । কিন্তু পদের কোন মোহ ছিল না কনফুসিয়াসের। তাঁর একমাত্র আকাঙ্খা ছিল জ্ঞান অর্জন । যে কোন পুঁথি পেলেই গভীর মনোযোগ সহকারে তা পড়তেন । উপলব্ধি করতে চেষ্টা করতেন তার অন্তর্নিহিত সত্য । তাই যখনই সময় পেতেন পুঁথি সংগ্রহ করতেন । কিম্বা যেখানেই কোন পুঁথিসন্ধান পেতেন সেখানেই ছুটে যেতেন ।

কনফুসিয়াসের চরিত্রের উদারতা মহত্ত্বতার কারণে সকলেই তাঁকে ভালবাসত । তখন কনফুসিয়াস সবেমাত্র যৌবনের পা দিয়েছেন । সকলের পরামর্শে বিবাহ করলেন। স্ত্রীর নাম পরিচয় সব কিছুই ছিল অজ্ঞাত । তার স্ত্রীর গর্ভে এক পুত্র, দুটি কন্যা  ( কারো মতে একটি কন্যা ) জন্মগ্রহণ করে । স্ত্রীর সঙ্গে কনফুসিয়াসের কি রকম সম্পর্ক ছিল তা জানা যায় না । সম্ভবত স্ত্রীর সাথে কনফুসিয়াসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল । অনেকের মতে স্ত্রীর মৃত্যু হয় ।

তাঁর কাজে খুশি হয়ে চি তাকে তার সমস্ত গবাদি পশুর দেখাশুনা করা, তাদের তত্ত্বাবধান করা, পালন করার সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করলেন । আপাতদৃষ্টিতে সহজসাধ্য মনে হলেও কাজটি ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ ।

কনফুসিয়াস তখন ত্রিশ বছরে পা দিয়েছেন । তিনি উপলব্ধি করছিলেন প্রকৃত জ্ঞান শুধু পুঁথির মধ্যে পাওয়া যাবে না । চারপাশের জগতে ছড়িয়ে রয়েছে জ্ঞানের উপকরণ । তিনি বেরিয়ে পড়তেন শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ।
এই ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন চীনদেশের প্রকৃত অবস্থা । দেখলেন সমস্ত দেশ জুড়ে শুধু অভাব অনটন । রাজা, রাজপুরুষদের নৈতিক অধঃপতন । প্রতিনিয়তই এক দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধ বিগ্রহ  চলেছে । কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা নেই । নেই ন্যায়নীতি, ধর্মবোধ ।

গভীর চিন্তার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন সমাজ জীবন, ব্যক্তি জীবন, রাষ্ট্রনৈতিক জীবন- সর্বক্ষেত্রেই  একই নির্দিষ্ট নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে ।
কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন আইন বা দন্ডের দ্বারা এই শৃঙ্খলাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না । আইন যতই কঠোর হবে ততই তাকে অমান্য করবার ইচ্ছা মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠবে । একমাত্র মানুষের অন্তরের বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে । আর এই বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে । আর এই বিবেকবোধ নীতিবোধই তাকে সঠিক শৃঙ্খলার পথে চালিত করতে পারে । আর এই বিবেকবোধ তখনই মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে যখন ধর্মীয় চেতনা জেগে উঠবে ।

কনফুসিয়াসের মধ্যেকার এই উপলব্ধি, গভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা দেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল । দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসতে আরম্ভ করল তাঁর কাছে । তাদের শিক্ষাদানের জন্য তিনি একটি এ্যাকাডেমি স্থাপন করলেন ।
কিন্তু কনফুসিয়াস শুধু জ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি । তিনি চেয়েছিলেন একজন আদর্শ শাসক হতে ।

তাই জ্ঞানী হিসাবে যেমন ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন, অন্যদিকে সংস্কারক হিসাবে সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন । নানান বিষয়ে সুপরামর্শ দিতেন ।

তাঁর আকৃতি ছিল কুৎসিত । অস্বাভাবিক দীর্ঘদেহ, মাথাটি ছিল বিশাল আকৃতির , চওড়া মুখ । ছোট দুটি যথেষ্ট বড় । নাকটি ছিল স্বাভাবিক দ্বিগুণ । যখন তিনি হাঁটতেন, হাত দুটো পাখির ডানার মত দুপাশে ছড়িয়ে থাকত । পিঠটা ছিল কালো কচ্ছপের মত ।

এই দৈহিক অপূর্ণতা সত্ত্বেও ভ্রমর যেমন মধুর আকর্ষণে ফুলের কাছে আসে, মানুষও তেমনি তাঁর জ্ঞানের প্রদীপ্ত শিখায় নিজেকে আলোকিত করবার জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকে ।
শিক্ষক হিসাবে আচার্য হিসাবে তাঁর খ্যাতি ক্রমশই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল । এতদিন শুধু সাধারণ ঘরের ছেলেরাই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করত । ক্রমশই অভিজাত ঘরের ছেলেরাও তাঁর কাছে জ্ঞান লাভের জন্য শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আরম্ভ করল । কনফুসিয়াস কোন দরিদ্র ছাত্রের কাছ থেকে অর্থ না নিলেও ধনীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন । ক্রমশই কনফুসিয়াস আর্থিক দিক থেকে সচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন ।

এই সময় আরো একটি ঘটনার অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে কনফুসিয়াসের প্রভাব আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেল ।

কিন্তু আকস্মিকভাবে দেশে দেখা দিল সামরিক বিপর্যয় । প্রতিবেশী দেশের আক্রমণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন কনফুসিয়াস । অন্য এক দেশে গিয়ে আশ্রয় নিলেন । সেই রাজ্যের শাসনকর্তার নাম ছিল চিং ।

কনফুসিয়াসের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই করে দিলেন । মাঝে মাঝেই তিনি কনফুসিয়াসের কাছে এসে নানান বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতেন । একদিন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, একজন শাসনকর্তার প্রকৃত সাফল্য কিভাবে নিরূপণ করা যায় ?

কনফুসিয়াস বললেন, একজন শাসক তখনই সফল যখন তিনি প্রকৃতই শাসক । ভৃত্য সকল সময়েই ভৃত্য । পিতা প্রকৃত ই পিতা, পুত্র সত্যিকারের পুত্র । ডিউক চিং উপলব্ধি করলেন কনফুসিয়াসের কথার প্রকুত তাৎপর্য । যিনি প্রকৃতই শাসক তার মধ্যে একাধিক গুণের সন্নিবেশ ঘটবে । একটি গুণের অভাব ঘটলেও তিনি প্রকৃত শাসক বলে পরিগণিত হবেন না ।

দীর্ঘ সাত বছর ডিউক চিং –এর রাজ্যে সুখেই দিন কাটিয়ে দিলেন কনফুসিয়াস ।
কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পর শিষ্যরা তাঁর সমাধিস্থলকে ঘিরে মন্দির গড়ে তুলল । সেখানেই কুঁড়েঘর করে বাস করতে থাকে । তিন বছর ধরে এইভাবে তারা শোক পালন করে ।

কনফুসিয়াস নতুন কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেননি । কোন মতবাদ বা দর্শনের জন্ম দেননি । বা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রতিষ্ঠা করেন নি । তিনি ছিলেন বাস্তববাদী । যা কিছু ছিল তাকেই নতুনভাবে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তন করেছেন । যখন কেউ তাকে স্বর্গ, ইশ্বর সম্বন্ধে প্রশ্ন করত, তিনি নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলতেন, এখানেই আছে স্বর্গ ইশ্বর ।

তিনি বলতেন, দয়া, সততা, পবিত্রতা, ভালবাসা, জ্ঞান, মহত্ত্বতা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ । এই সব গুণের মধ্যে দিয়েই মানুষ নিজেকে দেবত্বে উন্নীত করতে পারে, অন্যের শ্রদ্ধা-ভালবাসা অর্জন করতে পারে ।

কনফুসিয়াসের মধ্যে এই সমস্ত গুণের সমাবেশ ঘটেছিল বলেই আজ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে তার শ্রদ্ধার আসন পাতা রয়েছে ।

 

 

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

৮৭. আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ)

৮৭. আল্লামা শেখ সা’দী (রঃ) (১১৭৫-১২৯৫ খ্রিঃ) গগণের  উদারতা ও স্বর্গের শান্তির বাণী নিয়ে সময় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + one =