নীড় / মনীষীর জীবনী / ৫২.অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট
অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট

৫২.অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট

৫২.অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট
[১৮৭১-১৯৪৮][১৮৬৭-১৯১২]

উইলবারের জন্ম ১৮৬৭ সালে আমেরিকার ইণ্ডয়ানা প্রদেশে। অরভিলের জন্ম ১৮৭১ সালে। ছেলেবেলা থেকেই দু ভাই-এর মধ্যে ছিল যেমনই কল্পনাশক্তি তেমনি তীক্ষ্ন বুদ্ধি। পড়াশুনা শেষ করে দুই ভাই হাতে কলমে কাজ করবার জন্য ছোট কারখানা তৈরি করলেন, প্রথমে তাঁরা কিছুদিন বাজারে প্রচলিত ছাপার যন্ত্র নিয়ে কাজ শুরু করলেন যাতে তার ব্যবহার আরো সহজ সরল ও উন্নত হয়।

এর পর বাইসাইকেলের উন্নতির জন্য সচেষ্ট হলেন। দুটি ক্ষেত্রেই তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। এবং তাদের প্রবর্তিত আধুনিক যন্ত্র ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল।

তবে যে উড়োজাহাজ আবিষ্কারের জন্য দুই ভাই-এর খ্যাতি, তার চিন্তাভাবনা শুরু হয় ১৮৯৬ সাল থেকে।

একজন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার অটো লিলিয়েনথাল কয়েক বছর যাবৎ উড়ন্ত যান নিয়ে গবেষণা করছিলেন। লিলিয়েনথালের তৈরি যান আকাশে উড়লেও তাতে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হত।

১৮৯৬ সালে লিলিয়েনথালের আকস্মিক মৃত্যুতে গবেষণার কাজ সর্ম্পূণ বন্ধ হয়ে যায়।

লিলিয়েনথানের তৈরি উড়ন্ত যানের (Gliding Machine) নক্সা ভালভাবে পরীক্ষা করে রাইট ভাইরা দেখলেন যেমন তা অসর্স্পূণ অন্যদিকে তেমনি নানা ভুলক্রটিতে ভরা।

অল্প কিছুদিন পর তাঁরা বুঝতে পারলেন এই ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রকৃত সাফল্য অজন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আরো জ্ঞানের। পরির্পূণ জ্ঞান না হলে সাফল্য অনিশ্চিত।

ইতিমধ্যে এই বিষয়ে যা কিছু লেখা হয়েছে সমস্তই তাঁরা সংগ্রহ করলেন। নিরলস অধ্যাবসায় নিয়ে শুরু হল তাঁদের অধ্যায়ন।

শুধু যে র্পূবসূরীদের প্রচেষ্টা, তাদের সাফল্য র্ব্যথতার ইতিবৃত্ত অধ্যায়ন করলেন তাই নয়, তাঁরা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন রচনা থেকে জানলেন বাতাসের গতিবেগ, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে তার চাপ, ভারসাম্য নিণয়ের পদ্ধতি। তাছাড়া কিভাবে এতদিন বিভিন্ন উড়ন্ত যান নির্মাণ করা হত তার নির্মাণ কৌশল, আরো অসংখ্য বিষয়।

এল গ্লাইডার বা ছোট ছোট খেলনার আকৃতির যন্ত্র। যা নানান প্রক্রিয়ায় বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু তাতে তো মানুষের উড়া সম্ভব হত না।

দুই ভাই ছোট একটা কারখানা তৈরি করলেন। র্দীঘ এক বছরে প্রচেষ্টায় সেই কারখানায় তৈরি হল এক বিশাল গ্লাইডার বা উড়ন্ত যান। এতদিন যে ধরনের গ্লাইডার তৈরি হত এই গ্লাইডার তার চেয়ে একেবারে স্বতন্ত্র। এই গ্লাইডার বাতাসে ভারসাম্য রেখে সহজেই উড়ে যেতে পারে। গ্লাইডার-এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে রাইট ভাইয়েরা তৈরি করলেন দুই পাখাবিশিষ্ট ছোট বিমান। এই বিমানের সামনে ও পেছনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটা ছোট যন্ত্র জুড়ে দেওয়া হল। এর নাম এলিভেটর। এই এলিভেটরের সাহায্যেই পাইলট কোন বিমানকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। সমস্ত নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর শহরে থেকে দূরে  েএক নিজর্নে এই দুই পাখাওলা বিমানকে শূন্যে ভাসিয়ে দেওয়া হল। বেশ কয়েকবার বিমানকে আকাশে ওড়বার পর দুই ভাই বুঝতে পারলেন এখনো তাঁদের উদ্ভাবিত বিমানের কলাকৌশলের কিছু পরিবতন করার প্রয়োজন হলেও তাঁরা সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন।

আবার শুরু হল তাঁদের কমযজ্ঞ। এইবার লক্ষ্য কিভাবে গ্লাইডারকে শক্তিচালিত করা যায়।বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিন নিয়ে পরীক্ষা করবার পর দেখা গেল একমাত্র পেট্রল চালিত ছোট ইঞ্জিনই বিমান চালনার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এবং প্রতি তিন পাউন্ড ওজনের জন্য এক অশ্বশক্তি সম্পন্ন ইঞ্জিনের আবশ্যক।বাজারে যে সমস্ত ইঞ্জিন পাওয়া যায় তার প্রতিটিই গাড়ির ব্যবহারের জন্য, বিমান ব্যবহারের অনুপযুক্ত দুই ভাই ইঞ্জিন তৈরির কাজে হাত দিলেন। কয়েক মাসের চেষ্টায় তৈরি হল বিমানে ব্যবহারের উপযুক্ত ইঞ্জিন।

অবশেষে এল সেই দিন, ১৭ই ডিসেম্বর ১৯০৩। উইলবার ও অরভিল তাঁদের তৈরি বিমান নিয়ে এলেন Kitty Hawk শহরের প্রান্তে। মানুষ বিমানে চেপে মহাশূন্যে পাখির মত ভেসে বেড়াবে। এই সংবাদ আগেই শহরময় প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু কেউই একথা বিশ্বাস করল না। উপরন্তু দিনটা ছিল কনকনে ঠান্ডারদিন।

প্রথমে দুই ভাই তাঁদের বিমানের সাথে ইঞ্জিন যুক্ত করলেন। সমস্ত যন্ত্রপাতি শেষবারের মত পরীক্ষা করলেনঅ শেষ পযর্ন্ত দুই ভাইই নিশ্চিত হলেন তাঁদের তৈরি প্রথম এলোপ্লেন ওড়বার জন্য সর্ম্পূণভাবে প্রস্তুত হয়েছে। যদিও সেই সময় এরোপ্লেন (Aeroalene) নাম দেওয়া হয়নি। নাম দেওয়া হয়েছে রাইট ফ্লাইয়ার (Wright Flyer)।

ঘড়িতে দেখা গেল বারো সেকেন্ড বাতাসে ভেসেছিল রাইট ভাইদের প্রথম এরোপ্লেন। মাত্র বারো সেকেন্ড। কিন্তু উপস্থিত পাঁচজন এমনকি রাইট ভাইরাও সেদিন কল্পনা করতে পারেনি, ঐ স্বল্পক্ষণের বিমানযাত্রাই নতুন যুগের সূচনা করল, যে যুগ গতির যুগ, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছোটার যুগ। নিরাপদে অবতরণ করে অরভিল বিমান থেকে বেরিয়ে এলেন। এইবার উইলবারের পালা। ভাই-এর সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে উইলবার আকাশে ভেসে রইলেন ঊনষাট সেকেন্ড। এবং প্রায় ৮২০ ফিট দূরত্ব অতিক্রম করলেন। তারপর ধীরে ধীরে অবতরণ করলেন। সেই দিন আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। ঝড়ো বাতাসের বেগ বাড়ছিল।

সাফল্যের আনন্দে দুজনেই আত্মহারা। কয়েকদিন কেটে গেল। প্রাথমিক উত্তেজনার রেশটুকু স্তিমিত হয়ে আসতেই নতুন উদ্যমে আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুই ভাই। এইবার তৈরি হল আগের চেয়ে বড় আর শক্তিশালী বিমান।

দুই ভাই ঠিক করলেন তাঁদের এই সাফল্যের কথা সমস্ত মানুষকে জানাতে হবে। এতদিন যা ছিল শুধুমাত্র তাঁদের, আজ থেকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। আমেরিকার প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রকে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁদের আকাশে ওড়ার দৃশ্যকে প্রত্যক্ষ করতে।

সেদিন সকাল থেকে ঝোড়ো বাতাস বইছিল। নতুন ইঞ্জিনটাও ঠিকমত কাজ করছিল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আকাশে ওড়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হল।

রাইট ভাইরা শুধু সাংবাদিক নয়, বিশিষ্ট কিছু মানুষকেও নিমন্ত্রণ জানালেন তাঁদের আকাশে ওড়বার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবার জন্য। এই বার আর বিফলতা নয়। সকলে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে রাইট ভাইরা কেমন করে একে একে পাখির মত স্বচ্ছন্দে আকাশপথে বিমানে চড়ে উড়ে চলেছে। বাতাসের মত এই সংবাদ শুধু আমেরিকা নয়, ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দিক থেকে প্রশংসা আর অভিনন্দনবার্তা আসতে থাকে। তবুও নিজেদের অগ্যগতিতে সন্তুষ্ট হতে পারেন না রাইট ভাইয়েরা। আরো উন্নত ধরনের বিমান তৈরি করবার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তার জন্যে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। এগিয়ে আসে এক সিন্ডিকেট। তারাই প্রয়োজনীয় অথ প্রদানের সব ভার গ্রহন করে। নতুন সিন্ডিকেট অামেরিকান গভনমেণ্টের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। অরভিল চুক্তির শত অনুসারে আমেরিকায় রয়ে গেলেন, উদ্দেশ্য আরো উন্নত ধরনের বিমান তৈরি করা।

উইলবার ফ্রান্সে গেলেন। সেখানে দেখালেন বিমানে ওড়াবার কলাকৌশল। ফ্রান্সের বহু গণ্যমান্য ব্যাক্তি প্রতিদিন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসত।

একদিন আমেরিকায় অরবিল রাইট সামরিক বাহিনীর এক অফিসারকে সাতে নিয়ে যকন বিমানে আকাশপথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, সেই সময় আকস্মিক ভাবে একটা প্রপেলার ভেঙ্গে প্লেন মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল্ সৌভাগ্যক্রমে গুরুতর আহত অরভিলের প্রাণ রক্ষা হলেও সঙ্গী অফিসার দুঘটনাস্থলেই মারা যান। কিছুদিনের চিকিৎসায সুস্থ হয়ে উঠলেন অরভিল। ততদিনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এরোপ্লেন কেনবার জন্য আবেদন জানাতে থাকে। রাইট ভাইরা বুঝতে পারেন তাঁদের সুর্দীঘ পরিশ্রম নিষ্ঠা অধ্যবসায় এতদিনে সফল হয়েছে। সমস্ত পৃথিবীর সামনে তাঁরা এনে দিয়েছেন এক নতুন গতি। যে গতির কথা মানুষ কল্পনা করতে পারেনি।

অবশেষে ১৯১২ সালে উইলবার মারা গেলে। অরভিল তারপরেও বহু বছর বেঁচে ছিলেন। আমৃত্যু তিনিও বিমানে উন্নয়ন ও উৎপাদনের কাজে জীবন উৎসগ করে গিয়েছেন।

 

 

সম্বন্ধে সোনিয়া পারভিন

এছাড়াও পড়ুন

গুলিয়েলমো-মার্কোনি

৬২.গুলিয়েলমো মার্কোনি

৬২.গুলিয়েলমো মার্কোনি  [১৮৭৪-১৯৩৭] বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার মধ্যে রয়েছে টেলিফোন,গ্রামোফোন,রেডিও,চলচ্চিত্র টেলিভিশন,মোটরগাড়ি ও এরোপ্লেন। এইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − 7 =